সমকালীনপ্রসঙ্গ
গুম কমিশনের প্রতিবেদন কেন বাংলায় নয়
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৬
গুম সংক্রান্ত কমিশনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও স্পর্শকাতর একটি মানবাধিকার ইস্যুতে অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দলিল প্রণয়নের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রচর্চায় তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন।
২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন, ২০২৫ সালের ৬ জুন দ্বিতীয় প্রতিবেদন এবং ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন– এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, কমিশন একটি কাঠামোবদ্ধ ও পদ্ধতিগত উপায়ে তাদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সাক্ষ্য, অভিযোগ এবং অভিজ্ঞতাকে নথিবদ্ধ করার মাধ্যমে যেসব দলিল তৈরি হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নয়; ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়; এসব প্রতিবেদন কেন শুধু ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হলো?
গুম কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি প্রতিবেদনই ইংরেজি ভাষায় প্রণীত। এ বিষয়ে কমিশনের এক সদস্য জানালেন, কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনগুলো ইংরেজি ভাষাতেই প্রকাশ করেছে; বাংলা ভাষায় কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ এসব প্রতিবেদনের ভাষান্তর করে থাকতে পারেন।
প্রশ্নটি ভাষাগত পছন্দের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের নীতি, অগ্রাধিকার এবং জবাবদিহির কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জীবন, অধিকার ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট গুরুতর অভিযোগ অনুসন্ধান করে, সেই অনুসন্ধানের ফলাফল কোন ভাষায় প্রকাশ করা হবে, তা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে, বিশেষত উচ্চ আদালতসহ, বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার নীতিগত অঙ্গীকার বিদ্যমান। বিচারপ্রার্থীদের কাছে ন্যায়বিচারকে সহজলভ্য ও বোধগম্য করার লক্ষ্যে এই ভাষানীতি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। সেই প্রেক্ষাপটে গুমের মতো গভীর ও সংবেদনশীল মানবাধিকার ইস্যুতে প্রণীত তদন্ত প্রতিবেদন শুধু ইংরেজিতে প্রকাশ পাওয়া অসামঞ্জস্য তৈরি করে।
প্রতিবেদনটির মূল লক্ষ্য হয়তো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, কূটনৈতিক পরিমণ্ডল বা ইংরেজিভাষী একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, যাদের কাছে রাষ্ট্র তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী। কিন্তু যে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু, তাদের জন্য এই দলিল কতটা ব্যবহারযোগ্য বা বোধগম্য– সেই প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে মনে হয়। এখানে প্রশ্নটি সক্ষমতার নয়, বরং অগ্রাধিকারের। একটি কমিশন যদি বিস্তৃত অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা; অসংখ্য সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সুসংহত প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে পারে, তবে সেই প্রতিবেদন বাংলায় অনুবাদ ও প্রকাশ করার সক্ষমতা কমিশনের ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনআস্থা। গুমের মতো একটি ইস্যুতে যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েই বিতর্ক বিদ্যমান, সেখানে তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষাগত সীমাবদ্ধতা স্বচ্ছতার ধারণাকে দুর্বল করে। একটি প্রতিবেদন তখনই প্রকৃত অর্থে জনমুখী হয়, যখন তা নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত, বোধগম্য ও আলোচনাযোগ্য হয়।
ভাষা এখানে কেবল তথ্য পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত। যদি সেই ভাষা অধিকাংশ নাগরিকের নাগালের বাইরে থাকে, তবে সেই অংশগ্রহণও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে ন্যায়বিচারের যে ধারণা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা আংশিকভাবে হলেও বিঘ্নিত হয়।
অতএব, গুম সংক্রান্ত এসব প্রতিবেদনের ভাষা নির্বাচন একটি গুরুতর নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করে। এটি কেবল ত্রুটি নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থা ও জবাবদিহির ধারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর নির্ভুল ও প্রামাণ্য বাংলা অনুবাদ দ্রুত প্রকাশ করা উচিত। গুম কমিশনের প্রতিবেদন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি। তবে এই অগ্রগতির প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তার ফলাফল কেবল প্রণীত দলিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা নাগরিকদের বোধগম্যতার ভেতরে প্রবেশ করবে।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন
