ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফুয়েল লোডিং

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত মাইলফলক

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত মাইলফলক
×

মো. শফিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল নানা চাপে পড়েছে। অনেক দেশ জ্বালানিতে ভর্তুকি, জ্বালানিতে রেশনিং এবং জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বিশ্বজুড়ে ধীরে ধীরে কমতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামভিত্তিক ফিশন প্রযুক্তির পাশাপাশি সমুদ্রের পানির ডিউটেরিয়াম ব্যবহার করে ফিউশন প্রযুক্তিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে উন্নত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ আধুনিক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মাণের পাশাপাশি ছোট আকারের রিঅ্যাক্টর এবং আরও ক্ষুদ্র ক্ষমতার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। ছোট আকারের রিঅ্যাক্টর সাধারণত ৩০০ মেগাওয়াট বা তার কম ক্ষমতার হয়। আরও ক্ষুদ্র ক্ষমতার রিঅ্যাক্টর সাধারণত ১ থেকে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার হয়।

এ ধরনের রিঅ্যাক্টর মডিউলার পদ্ধতিতে কারখানায় তৈরি করে দ্রুত স্থাপন করা যায়। এগুলো শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, বরং সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন, সমুদ্রের নোনাপানি বিশুদ্ধকরণ এবং শিল্পকারখানায় তাপ সরবরাহের ক্ষেত্রেও ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করছে। ছোট আকারের রিয়্যাক্টর কয়লা কিংবা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাবমেরিনে একটানা ২০-২৫ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহে ছোট আকারের পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর ব্যবহারের উদাহরণ নতুন নয়।

আর ক্ষুদ্র ক্ষমতার রিঅ্যাক্টর দূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল, খনি এলাকা, সামরিক ঘাঁটি, গবেষণা কেন্দ্র এবং বড় বড় ডাটা সেন্টারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশ এই প্রযুক্তি উন্নয়নে এগিয়ে রয়েছে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন মেটা, গুগল এবং মাইক্রোসফট তাদের ডেটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। রূপপুরে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রাশিয়ার তৈরি প্রজন্ম-৩+ শ্রেণির দুটি আধুনিক ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর নির্মাণ করা হচ্ছে।

রিঅ্যাক্টরে ফুয়েল স্থাপন কার্যক্রম সাধারণত দেড় থেকে দুই মাস সময় নেয়। এরপর কমিশনিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রায় শূন্য শক্তিতে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা হয়। এটিকে বলা হয় রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি। এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হয়।

সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে পরবর্তী ধাপে রিঅ্যাক্টরকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে যুক্ত করে ধীরে ধীরে বিভিন্ন শক্তি স্তরে পরিচালনা করা হয়। এ সময় রিঅ্যাক্টরের যন্ত্রপাতি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষামূলক রিঅ্যাক্টর পরিচালনা করা হয়।
সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে এবং পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স প্রাপ্তির পর পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা এবং তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এটি কমিশনিং পর্যায়ের শেষ ধাপ। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।

একবার বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। প্রায় ১৮ মাস পরপর জ্বালানি পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় দুই মাসের জন্য রিঅ্যাক্টর বন্ধ রাখতে হয়। এরপর পুনরায় চালু করে আবার ১৮ মাস ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা হয়। এভাবে একটি রিঅ্যাক্টর সাধারণত প্রায় ৬০ বছর পর্যন্ত পরিচালিত হতে পারে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি বেজলোড প্লান্ট। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা গুরুতর প্রযুক্তিগত ত্রুটি না দেখা দিলে রিঅ্যাক্টর সাধারণত বন্ধ করার প্রয়োজন হয় না। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একদিন বন্ধ থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়। কারণ সমপরিমাণ বিদ্যুৎ অন্যান্য প্রচলিত উৎস থেকে উৎপাদন করতে অনেক বেশি ব্যয় হয়।

আমাদের এখন প্রয়োজন নিরাপদভাবে রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কঠোরভাবে নিরাপত্তা সংস্কৃতি অনুসরণ করা। বৈদেশিক নির্ভরশীলতা কমাতে এবং জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন হোক– এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাক্তন ভিজিটিং প্রফেসর, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র
[email protected]

আরও পড়ুন

×