ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

ছেষট্টি বছরে পাবনা প্রেস ক্লাব

ছেষট্টি বছরে পাবনা প্রেস ক্লাব
×

ফারুক হোসেন চৌধুরী

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণমানুষের কণ্ঠস্বর এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নাম পাবনা প্রেস ক্লাব। দীর্ঘ সময়ের পথচলায় এই প্রতিষ্ঠান শুধু সাংবাদিকদের মিলনকেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আজ ৬৬ বছরে পদার্পণ করেছে পাবনা প্রেস ক্লাব।

ষাটের দশকের শুরুতে সেই সময়ে যখন দেশের জেলা শহরগুলোতে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার পরিধি ছিল সীমিত, তখন পুরোনো জেলা শহর পাবনায় এক দল দূরদর্শী সাংবাদিক ও সমাজ সচেতন মানুষ প্রতিষ্ঠা করেন পাবনা প্রেস ক্লাব। ১৯৬১ সালের ১ মে দৈনিক আজাদ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি)-এর পাবনা প্রতিনিধি এ কে এম আজিজুল হক বিএসসির সভাপতিত্বে শহরে তাঁর বাসা সান ভিলায় পাবনা প্রেস ক্লাবের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। তিনি সভাপতি এবং সংবাদ প্রতিনিধি রণেশ মৈত্র (একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসংগ্রামী) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভাষাসংগ্রামী দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি এম আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট চিকিৎসক মেজর (অব.) মোফাজ্জল হোসেন, পাবনা জিলা স্কুলের শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন আহমেদ (১৯৭১-এ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা), চিত্রসাংবাদিক হিমাংশু বিশ্বাস প্রথম কমিটিতে সদস্য ছিলেন। পরে পেশাগত সাংবাদিক হিসেবে আরও অনেক বরেণ্য সাংবাদিক প্রেস ক্লাবের সদস্য হন। আজীবন সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার (প্রয়াত), স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী (প্রয়াত), ভাষাসংগ্রামী আব্দুল মতিন (প্রয়াত) ও স্কয়ার টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু প্রেস ক্লাবের গৌরবকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পাবনা প্রেস ক্লাবের ২২তম সদস্য। প্রেস ক্লাবের ৯ জন সদস্য মুক্তিযোদ্ধা; তিনজন ছিলেন ভাষাসংগ্রামী। 
সময়ের বাস্তবতায় পাবনার মতো পিছিয়ে পড়া শহরে পাবনা প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা ছিল অত্যন্ত সাহসী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কারণ, তখন সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য আদান-প্রদান কিংবা পেশাগত নিরাপত্তা– সবকিছু ছিল নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ। সেই প্রতিকূল সময়ে প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের একটি আশ্রয়স্থল, মতবিনিময়ের কেন্দ্র এবং পেশাগত চেতনার বাতিঘর হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ সময়ের পথচলায় পাবনা প্রেস ক্লাব জেলার সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নবীন সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনে উৎসাহ এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই সক্রিয় থেকেছে। একই সঙ্গে সামাজিক অন্যায়, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের নৈতিক শক্তি ও পেশাগত সাহস জুগিয়েছে।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি অনলাইন, টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসহ সামাজিক মাধ্যম এখন সংবাদ পরিবেশনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা, তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীলতা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাবনা প্রেস ক্লাবকে আরও আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক এবং প্রশিক্ষণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে তরুণ সাংবাদিকদের নৈতিক সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনে উৎসাহিত করা এবং গণমানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা হতে পারে প্রেস ক্লাবের আগামী দিনের বিশেষ অঙ্গীকার। সাংবাদিক সমাজের ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও পেশাগত মর্যাদা পালন করতে হবে।
দীর্ঘ সময়ের এই গৌরব যাত্রা পাবনার সাংবাদিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বরের ইতিহাস। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় সেই সব প্রবীণ সাংবাদিক ও সংগঠককে, যাদের দূরদর্শিতা, ত্যাগ ও নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। পাবনা প্রেস ক্লাব তার গৌরব, বর্তমানের দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যয় নিয়ে আরও শক্তিশালী হোক– এটাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রত্যাশা।

মো. ফারুক হোসেন চৌধুরী: অতিরিক্ত পরিচালক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তর, পাবনা বিজ্ঞান ও 
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×