বাংলাদেশ-ভারত
কূটনীতির মঞ্চে রাজনীতির ছায়া কিংবা নতুন সমীকরণ
ফাইল ছবি
ফয়সাল মাহমুদ
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ২০:২৪
দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের সাম্প্রতিক মোড় বুঝতে প্রটোকলের চশমা যথেষ্ট নয়। দরকার রাজনৈতিক পাঠ। কারণ, এটি কেবল একজন দূতের বিদায় আর আরেকজনের আগমন নয়। এর ভেতরে আছে পরিকল্পনা। কৌশল। সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য। কূটনীতির প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়েছে রাজনীতির সরাসরি উপস্থিতি।
এই পরিবর্তনের প্রতীক দিনেশ ত্রিবেদী। তাঁকে ঢাকায় ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়েছে। সিদ্ধান্তটি নিছক প্রশাসনিক নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। দিল্লি জানাতে চায়, বাংলাদেশকে তারা এখন ভিন্ন চোখে দেখছে। নতুন বাস্তবতায় নতুন পদ্ধতি প্রয়োজন– এটাই যেন এই পদক্ষেপের সার কথা।
দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির বাংলাদেশ নীতি অনেকাংশে নির্ভর করেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর, বিশেষত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের ভিত্তিতে। সেই সমীকরণ কার্যকরও ছিল। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা কখনও স্থির থাকে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। ক্ষমতার ভারসাম্য, জনমতের প্রবাহ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা– সব মিলিয়ে নতুন এক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনকে সামনে রেখেই দিল্লি তার কৌশল পুনর্গঠন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে একজন পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পাঠানো তাৎপর্যপূর্ণ। এটি স্পষ্ট করে, দিল্লি এখন ফাইলভিত্তিক যোগাযোগের সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি রাজনৈতিক স্তরে সম্পর্ক গড়তে চায়। কারণ, নতুন বাংলাদেশের নাড়ি বোঝার জন্য শুধু সরকারি দপ্তরের দরজা খুললেই হবে না; দরকার রাজনৈতিক অন্দরমহলে প্রবেশের ক্ষমতা।
ত্রিবেদীর শক্তি এখানেই। তিনি সংসদীয় রাজনীতির মানুষ। ক্ষমতার করিডোরে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘ। তিনি জানেন কখন নীরব থাকতে হয়, কখন কথা বলতে হয়। তিনি বুঝতে পারেন কোন সংকেত প্রকাশ্য, আর কোনটি অপ্রকাশ্য। এই ধরনের দক্ষতা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক কূটনীতির চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন সম্পর্কের ভেতরে অনিশ্চয়তা থাকে।
ইতিহাসও এই ধরনের উদাহরণে ভরা। যখন সম্পর্ক জটিল হয়, তখন রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় পেশাদার কূটনীতিকের পাশাপাশি বা তাদের বদলে রাজনৈতিক দূত পাঠায়। কারণ, রাজনীতিকরা প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে দ্রুত অগ্রগতি ঘটাতে পারেন। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকেন। ফলে বার্তা আদান-প্রদান হয় দ্রুত, কখনও কখনও আরও খোলামেলা।
তবে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও প্রশ্ন তৈরি করে। স্বাধীনতার পর থেকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারদের অধিকাংশই ছিলেন পেশাদার কূটনীতিক। এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য। এর ভেতরে আছে অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এবং ধারাবাহিকতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে– বর্তমান বাস্তবতায় এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর?
ভারত বাংলাদেশের জন্য কোনো সাধারণ দেশ নয়। এটি নিকটতম প্রতিবেশী, বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারদের একটি, জ্বালানি ও ট্রানজিটের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাবক। এই সম্পর্কের গভীরতা ও জটিলতা এমন, এটিকে কেবল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। তবুও ঢাকা অনেক সময় দিল্লির এই পদটিকে কৌশলগত রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে একটি উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক নিয়োগ হিসেবেই বিবেচনা করেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে– এই দৃষ্টিভঙ্গি কি পরিবর্তনের দাবি রাখে?
কূটনীতির রাজনীতিকীকরণ একদিকে সুযোগ এনে দেয়, অন্যদিকে ঝুঁকিও বাড়ায়। রাজনীতিকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তারা প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে পারেন। অনেক সময় আটকে থাকা আলোচনা এগিয়ে নিতে তাদের ভূমিকা কার্যকর হয়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বড় সীমাবদ্ধতাও আছে– তারা প্রায়ই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভকে অগ্রাধিকার দেন। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সেখানে পেছনে পড়ে যেতে পারে।
ঢাকাও যদি একই পথে হাঁটে এবং দিল্লিতে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিনিধি পাঠায়, তাহলে সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে যেতে পারে। তখন এটি আর কেবল দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সংলাপ থাকবে না; বরং দুই দেশের রাজনৈতিক শক্তির এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মঞ্চে পরিণত হতে পারে। এতে যোগাযোগ বাড়তে পারে, কিন্তু উত্তেজনাও বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।
এই ঝুঁকির বাস্তবতা স্পষ্ট হয় যখন আমরা সম্পর্কের সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর দিকে তাকাই। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ঘাটতি–এসব বিষয় অত্যন্ত জটিল এবং আবেগপ্রবণ। এগুলো যদি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সমাধান আরও কঠিন হতে পারে। কারণ রাজনীতি স্বভাবতই প্রতিক্রিয়াশীল, সেখানে ধৈর্য কম থাকে। অথচ কূটনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতের প্রভাব। বাংলাদেশ ও ভারত– দুই দেশেই জাতীয়তাবাদী আবেগ প্রবল। কোনো সিদ্ধান্ত কেবল কৌশলগত বিবেচনায় নেওয়া হয় না; সেটি জনমতের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমের যুগে এই চাপ আরও বেড়েছে। ফলে ছোট একটি ঘটনা বা বক্তব্যও দ্রুত বড় রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দিল্লির লক্ষ্য পরিষ্কার। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব অটুট রাখা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মোকাবিলা করা। বাংলাদেশ এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ– সব মিলিয়ে এটি একটি কৌশলগত কেন্দ্র।
অন্যদিকে, বাংলাদেশও এখন আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বৈশ্বিক সংযোগ এবং বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি– সব মিলিয়ে তারা একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করতে চায় না। ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে চায়।
এ দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে প্রয়োজন একটি দ্বিস্তরীয় কৌশল। একদিকে রাজনৈতিক সংযোগ থাকবে, যা দ্রুত যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। অন্যদিকে পেশাদার কূটনীতির সূক্ষ্মতা থাকবে, যা সম্পর্ককে স্থায়িত্ব দেবে।
বিশ্বাস পুনর্গঠনও জরুরি। নিয়মিত সংলাপ, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান– এই তিনটি বিষয় ছাড়া সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানো কঠিন। রাজনৈতিক উদ্যোগ দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে টেকসই সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে কূটনীতির ধৈর্য অপরিহার্য।
দিল্লি ও ঢাকা– উভয় পক্ষের সামনে এখন একটি সন্ধিক্ষণ। এই রাজনৈতিক উদ্যোগ কি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি সুযোগ হয়ে উঠবে? নাকি এটি সম্পর্ককে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলবে?
প্রশ্নটি সরল, উত্তর জটিল। সম্পর্ক কি হবে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে, নাকি শক্তি প্রদর্শনের ওপর?
যদি কূটনীতির ওপর রাজনীতির প্রভাব অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তাহলে সম্পর্কের স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আর যদি দুপক্ষ ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে এই পরিবর্তনই হতে পারে একটি নতুন, আরও বাস্তবসম্মত সম্পর্কের ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত, পথটি বেছে নেওয়ার দায়িত্ব দুই দেশেরই।
ফয়সাল মাহমুদ: সাংবাদিক; নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার
