হাওরে ফসলহানি
স্থায়ী সমাধান জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত বিভিন্ন হাওরে কয়েক লক্ষ কৃষকের বোরো ধান এখন পানিতে নিমজ্জিত বলিয়া বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালে যে খবর ছাপা হইয়াছে তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টিপাতের আভাস দিয়াছিল আবহাওয়া বিভাগ। তাহারা হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও ঢলের সতর্কতাও জানাইয়াছিল। তৎসহিত কৃষি বিভাগ পাকা ধান দ্রুত কাটিয়া লইবার পরামর্শ দিয়াছিল এবং খোদ কৃষিমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, কোনোরূপে হাওরের ধান নষ্ট হইতে দেওয়া যাইবে না। কিন্তু কিছুতেই শেষ রক্ষা হইল না।
প্রতিবেদন বলিতেছে, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জগন্নাথপুরের মতো অঞ্চলে নদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জমির আধা পাকা ও পাকা ধান এখন পানিতে নিমজ্জিত। সুনামগঞ্জে দুই দিনে ৫০৫ হেক্টর, কিশোরগঞ্জে প্রায় দুই সহস্র হেক্টর, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে অন্তত ৪০০ হেক্টর জমির ফসল ডুবিয়াছে। মৌলভীবাজারেও কয়েক সহস্র হেক্টর জমি প্লাবিত। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের বহু গুণ। যাহারা কোনোক্রমে ধান কাটিতে পারিয়াছেন তাহাদের কাহারও ধান খলায় পচিতেছে, কাহারও বস্তা ভরা ধানে চারা গজাইয়াছে। এই সকল কৃষকের অধিকাংশই চড়া সুদে ঋণ করিয়া বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ বাবদ ব্যয় করিয়া থাকেন। সেই ঋণ শোধ করিতে হয় ধান বিক্রয় করিয়া। তন্মধ্যে এই বিপর্যয় ঘটিল। এই কথাও বলা প্রয়োজন, হাওরের ধান নিছক সংশ্লিষ্ট কৃষকের ব্যক্তিগত সম্পদ নহে। উহা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বৎসর উৎপাদিত ধানের সিংহভাগ জোগায় বোরো মৌসুম; উহার এক-পঞ্চমাংশ আসে হাওর হইতে।
এই সময়ে হাওরে আকস্মিক ঢল নূতন কোনো ঘটনা নহে। ইতোপূর্বে বহুবার এহেন বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটিয়াছে। কিন্তু উহার পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধের উপায় লইয়া জনপরিসরে এবং সরকারি মহলে ইতোপূর্বে যত আলোচনা হইয়াছে; বাস্তবে পদক্ষেপ সেই অনুসারে গৃহীত হয় নাই। কৃষকের অভিযোগ, সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ না করিতে পারা, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা এবং অপরিকল্পিত সড়ক তৈয়ারের কারণে এতদঞ্চলে গত কয়েক সপ্তাহ পূর্বেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হইয়াছিল। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে সীমান্তের অপর পার হইতে আসা পানির ঢল। হাওরের ডুবন্ত বাঁধসমূহ সঠিক সময়ে, বৈজ্ঞানিক উপায়ে এবং দুর্নীতিমুক্তভাবে নির্মাণ ও সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যার পূর্বেই কাটা যায় এইরূপ আগাম জাতের ধান রোপণ সম্ভব কিনা, তাহাও গুরুত্বের দাবিদার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দলীয় বা নির্দলীয় সকল সরকারই এই বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে।
এখন এই সকল কৃষক কী করিবে? রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাহাদের পার্শ্বে দাঁড়ানো। আশার কথা, আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কথা বিবেচনা করিয়া সরকার ইতোমধ্যে হাওরাঞ্চলের ছয় জেলায় বোরো ধান-চাউল সংগ্রহ কার্যক্রম ১২ দিন আগাইয়া আনিয়াছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, আজ রবিবার হইতেই এই সকল এলাকায় ধান-চাউল ক্রয় শুরু হইতেছে। তবে এই কার্যক্রম দুর্নীতি-অনিয়মমুক্ত হইতে হইবে। সর্বোপরি সংসারের ব্যয় সংগ্রহ এবং ঋণ পরিশোধের স্বার্থে যাহাদের অনেকাংশে ভিজা ধানই বিক্রয় করিতে হয়, সেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকবান্ধব হইতে হইবে উক্ত কর্মসূচিকে। স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা, তৎসহিত আগামী মৌসুমে চাষাবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। সঠিক ব্যবস্থাপনায় সমগ্র বৎসর হাওরে উপযুক্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণের বিষয়টিও ভাবিতে হইবে। অন্যথায় এহেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবারই অভাগা কৃষকদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করিবে। মনে রাখিতে হইবে, কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না গেলে টেকসই অর্থনীতি গড়িয়া তোলা সম্ভবপর নহে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
