জনস্বাস্থ্য
আলীকদমে ‘হাম’ ধামাচাপা দেওয়া গেল না
পাভেল পার্থ
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৪২
বাংলাদেশে আজ টিকাবঞ্চিত হাম-আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘ লাইন। এমন হাম-মহামারি আগে দেখেনি দেশ। ২০২৬ সালের ভেতর যেখানে হাম শতভাগ নির্মূলের অঙ্গীকার, সেখানে সমতল থেকে পাহাড়; গ্রাম থেকে শহর– সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে হাম। এর আগেও দেশে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নভাবে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল; শিশুরা মারাও গিয়েছিল।
কিন্তু রাষ্ট্র তৎপর হয়নি, বরং পাহাড়ে হামের সংক্রমণে অধিকাংশ সময়ই একে ‘অজ্ঞাত’ রোগ হিসেবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এবার আর সেই জবরদস্তি খাটেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৩৩ হাজার ৩৮৬ শিশুর। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২২ হাজার ৪৪২ শিশু এবং এদের ভেতর ১৯ হাজার ১৮ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৪ হাজার ৬৯৩ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ২৬৪ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৪৪ শিশু। যদিও জানি না, পাহাড়ের তিন ম্রো শিশুসহ দেশের সব অঞ্চলের হামে নিহত শিশুর মৃত্যু এ খতিয়ানে যুক্ত হয়েছে কিনা।
মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা বান্দরবানের আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নে ১৩৫টি পাড়া আছে। পাহাড়ি এই গ্রামগুলো থেকে উপজেলা সদরের হাসপাতালে হেঁটে যেতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। এ ছাড়া কোনো হাসপাতাল নেই ধারেকাছে। জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসকুড়ির উপসর্গ নিয়ে সম্প্রতি এখানকার তিন ম্রো শিশু মারা গেছে। এগুলো হামের উপসর্গ। এমন উপসর্গ নিয়ে এপ্রিলের দুই সপ্তাহে ৬১ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। ভর্তি হয়েছে ২৮ শিশু। ইউনিয়নের ইয়াংরিংপাড়ার প্রেন্নই হোস্টেল নামে এক অনাথ আশ্রমে ১৫০ জন ম্রো শিশু পড়ালেখা করে। তাদের মধ্যেও ছড়িয়েছে হামের উপসর্গ।
প্রেন্নই হোস্টেলের পরিচালক উথোয়াইংগ্য মারমা তাদের আশ্রমের ৬০ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে বলে জানান। বান্দরবান জেলা সিভিল সার্জন গণমাধ্যমে বলেছেন, অনেক দুর্গম এলাকা আছে যেখানে হেলিকপ্টার ছাড়া টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করা অসম্ভব। এমন ‘দুর্গম’ অঞ্চলে বহুজাতিক বাজার কিংবা বাণিজ্যিক পর্যটন অনায়াসে যেতে পারে আর রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাসেবা কেন পারে না– এ প্রশ্ন তোলা জরুরি।
এর আগেও পাহাড়ের শিশুরা আক্রান্ত হয়েছে হাম ও ‘অজ্ঞাত’ অসুখে। ২০১৫ সালের মে মাসেও রাঙামাটির পর্যটন এলাকা সাজেকে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সাতজনের করুণ মৃত্যু হয়। যদিও সাজেক নিয়ে ইউটিউবে মাতম তোলা পর্যটকরা বিনা চিকিৎসায় পাহাড়ে শিশুমৃত্যু বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি কখনোই। ২০১২ সালে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি ও জুরাছড়ি উপজেলা এবং বান্দরবানের থানচি ও রুমাতে নিদারুণ খাদ্য সংকটকালেও শহরের পর্যটকরা কেবল ‘নিসর্গ বিনোদন’-এর ভিডিও বানিয়েছেন।
আমাদের কি স্মরণে আছে, কী ঘটেছিল ২০১৭ সালে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে? ২০১৭ সালের ৮ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত সেখানকার সোনাইছড়ি ত্রিপুরা গ্রামের ৯ শিশু হামে নিহত হয়। একের পর এক হামে ত্রিপুরা শিশুরা আক্রান্ত ও নিহত হতে থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথমদিকে হামকে ‘অজ্ঞাত রোগ’ হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন। পরে জানা যায়, সীতাকুণ্ড পাহাড়ে কোনোদিন রাষ্ট্রের টিকাদান কর্মসূচির দেখা মেলেনি।
সীতাকুণ্ডের হাম-কাণ্ডের সময়েও আক্রান্ত শিশুদের জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি ও গুটি, বমি, কণ্ঠগ্রন্থি ফোলা, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ ছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা রোগটি শনাক্ত করতে না পেরে বলেছিলেন– ‘অজ্ঞাত’। সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নূরুল করিম রাশেদ তখন দৈনিক ইনকিলাবকে বলেছিলেন, ‘পুষ্টিহীনতার কারণেই ত্রিপুরাদের এমন হয়েছে। তাদের খাদ্য ঠিক নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। দূষিত পানিপান, পচা শূকরের মতো খাবার খাওয়ায় তাদের নানা ধরনের জীবাণু আক্রমণ করছে (১৬-৭-১৭)।’
এমন চিকিৎসকরা কি এখনও চিকিৎসা বাদ দিয়ে কর্তৃত্ববাদ চাপিয়ে দেওয়ার বাণিজ্য করে যাচ্ছেন? সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া হাম-মহামারিকেও নিশ্চয় তারা এখনও ‘সন্দেহ’ করছেন। এ ধরনের চিকিৎসকের ভয়াবহ রকম কাণ্ডজ্ঞানহীনতা, ফাঁকিবাজি ও দায়িত্বে অবহেলার কারণেই দিনের পর দিন পাহাড়ে হামে মরেছে শিশুরা। এমনতর বাইনারি প্রতাপই শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি বিগত ইন্টেরিম রেজিমে বন্ধ রেখে আজ দেশব্যাপী শিশুদের নির্মম মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা শিশুদের ‘অজ্ঞাত’ রোগে মৃত্যু নিয়ে ‘রোগতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক’ তদন্ত শেষে ১৭ জুলাই রাষ্ট্রীয় সংবাদ সম্মেলনে শেষমেশ কর্তৃপক্ষ জানাতে বাধ্য হয়– সীতাকুণ্ডে হামের সংক্রমণ ঘটেছে এবং হামের কারণেই শিশুদের মৃত্যু ঘটেছে। তারা এও জানায়, যথাসময়ে আধুনিক চিকিৎসা পেলে শিশুমৃত্যু ঠেকানো যেত (সমকাল, ১৮ জুলাই ২০১৭)।
১৯৭৯ সাল থেকে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও নানা সময়ে হামে মৃত্যুর ঘটনায় প্রমাণিত হয়– পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং আদিবাসী অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় টিকাদান কর্মসূচি পৌঁছায় না। হামের মতো সাধারণ রোগে বছরের পর বছর নিহত পাহাড়ের শিশুদের ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের টিকাদান কর্মসূচিও বৈষম্যমূলক বাইনারি মনস্তত্ত্ব ধারণ করে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে জাত্যাভিমানী করে তোলা অন্যায়। কারণ সংবিধানমতে, শিশুসহ দেশের সব প্রান্তের সব শ্রেণি-বর্গের নাগরিক রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখে। তাহলে কেন বছরের পর বছর পাহাড়ে হাম ছড়িয়ে পড়ে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এসব রোগকে ‘অজ্ঞাত’ বলে উড়িয়ে দিতে চান এবং তথাকথিত ‘দুর্গমতা’র অজুহাতে নিজেদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাকে আড়াল করতে চান? আলীকদমের পাহাড় থেকে রাজধানী শহরসহ দেশের সর্বত্র হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো এখন প্রধান রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হওয়া দরকার। একটি শিশুও যেন আর ঢলে না পড়ে– সব মন্ত্রণালয়, দপ্তর, বিভাগসহ সর্বনাগরিকের মাধ্যমে গড়ে উঠুক জাতীয় সুরক্ষা ও দায়িত্বশীলতার বলয়।
পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক
[email protected]
- বিষয় :
- পাভেল পার্থ
