তাৎক্ষণিক
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের তাৎপর্য ও পরিণতি
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:০৪ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১১:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিহার ও উড়িষ্যার পর বাংলাও জয় করল ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি। প্রাচীন অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ কার্যত গেরুয়া শিবিরের দখলে গেল। পশ্চিমবঙ্গে গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল সোমবার প্রকাশিত হলে দেখা যাচ্ছে, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিরোধী দল বিজেপির আসন ২০০ পার হয়ে গেছে; ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস একশর নিচে নেমে এসেছে।
গতবারের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি থেকে এবার বিজেপি যেভাবে একলাফে ২০০ পার হলো, সেটাকে সুনামি বললেও ভুল হয় না। সেখানে ৮০ বা তার কিছু বেশি আসনে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটই নির্ণায়ক। অর্থাৎ বিজেপিকে নির্বাচনী পরীক্ষায় বসতে হয়েছে প্রায় তিনশর মধ্যে ৮০ নম্বর বাদ দিয়ে। স্পষ্টত, মুসলমানরা যেমন দল বেঁধে মমতাকে এতদিন ভোট দিয়েছেন, তেমনি এবার হিন্দুরাও অনুরূপ বিজেপির বাক্স ভরেছেন।
বিজেপির এই জয়ের তাৎপর্য কী? ভারতের অন্য সব রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুপ্রধান হলেও ধর্মীয় রীতনীতিতে বহুলাংশেই আলাদা। এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও সমৃদ্ধ। যে কারণে অর্ধশতাব্দী ধরে দেখা যাচ্ছে, দিল্লির শাসক দলের জোয়ার এই রাজ্যে এসে থেমে গেছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন না থাকলেও বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস যথাক্রমে ৩৪ বছর ও ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেছে। যেমন কংগ্রেস, তেমনি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মসনদে সুবিধা করতে পারেনি। ভাষার প্রশ্নেও হিন্দিবিরোধী একটা ফল্গুধারা পশ্চিমবঙ্গে বহমান। তাই হিন্দি-শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিজেপির আবেদনও এতদিন জোরালো ছিল না তাদের কাছে। এ প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বামফ্রন্টের মতো মমতাও টানা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেছেন।
বলা যেতে পারে, বিহার জয়ের মধ্য দিয়ে হিন্দিভাষী অঞ্চলে বিজেপির আধিপত্য পূর্ণতা পেয়েছিল। উড়িষ্যা দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলের অ-হিন্দিভাষী অঞ্চলের বিজেপির যে জয়যাত্রা সূচিত হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেটা নিরঙ্কুশ হলো।
একদিক থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় অবধারিত ছিল। বিশেষত জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে একসময়ে শীর্ষস্থানীয় পশ্চিমবঙ্গ এখন প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কেন্দ্রের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাতে বিগত বহু দশক রাজ্যটি কেন্দ্রের ন্যায্য আর্থিক প্রকল্প ও অনুদান থেকে বঞ্চিত। নিজেরাও বিনিয়োগ আনতে পারেনি। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট ইদানীং চরমে উঠেছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নাগরিক সুবিধার সংকটও প্রকট। আইনশৃঙ্খলার অবনতির সঙ্গে দুর্নীতি-অনিয়মও ব্যাপক।
তবে বিজেপির জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর বোধ হয় বামফ্রন্ট ও মমতার মুসলিম ভোটব্যাংক ব্যবহার করে অন্যসব সংকট চাপা দেওয়ার অপকৌশল। মনে করা হয়, ক্ষয়িষ্ণু হলেও উনিশ ও বিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁর প্রভাবে একটা সেক্যুলার বাতাবরণ বরাবরই বিশেষ করে সেখানকার মধ্যবিত্তের মাঝে ছিল। ফলে ভোটদানের ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল। এ কারণেই বহু ব্যর্থতার পরও বামফ্রন্ট ও মমতা পর্যায়ক্রমে প্রায় ৫০ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছেন। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, বামফ্রন্টের শেষ কয়েক মেয়াদ ও মমতার শেষ দুই মেয়াদ বিশেষত মুসলিম ভোটব্যাংকের কারণে রক্ষা পেয়েছে।
বলে রাখা দরকার, ১৯৭৭ সালে হিন্দু-মুসলিম উভয়ে মিলেই কংগ্রেসকে হটিয়ে বামফ্রন্টকে ক্ষমতায় আনে। ২০১১ সালে মমতার ক্ষমতা গ্রহণের সময় একই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এবার যখন তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাধারণ জনমত গড়ে উঠেছে তখন মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতে ছিল ভিন্নচিত্র। তাদের কাছে তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে কোনো শক্তিশালী সেক্যুলার দল ছিল না, যেমনটা ছিল আগের দুই পালাবদলের বেলায়। কিন্তু বিষয়টা তৃণমূল হটাতে বদ্ধপরিকর সাধারণ হিন্দুদের একযোগে ভোট দিতে বাধ্য করেছে।
এটা সত্য, বিজেপির মুসলিমবিরোধী বুলি-বচন কিছুটা হলেও সাধারণ হিন্দুদের প্রভাবিত করেছে। তাই বলে সেখানকার বাঙালি হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে– এমনটা বলা যায় না। বিষয়টা পরিষ্কার হবে বিজেপির অন্তত এক মেয়াদ শাসন শেষে তাদের আচরণ দেখে। এ বিষয় বিশেষ করে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের আগামী দিনের ভূমিকার ওপরেও নির্ভর করে। ভোটে হারার পর তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির আসন্ন অপকৌশল ও আক্রমণের মুখে কতটা টিকতে পারবে, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। তাই সেক্যুলার শক্তির মুখ হতে পারে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস।
বিজেপির এ জয় যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সমাজকে অস্থিরতামুক্ত করবে না– তা নিশ্চিত। যেমন সেখানে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলিমদের বাংলাদেশি হিসেবে তুলে ধরে বিজেপি ভোটের প্রচারে বলেছে, এসব ‘অনুপ্রবেশকারীকে’ ‘বাংলার মাটি’ থেকেই সরিয়ে দেওয়া হবে। এটা বাংলাদেশেরও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার ও নেতারা ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তায় অগ্রাধিকার ইস্যু হিসেবে প্রচার করেছেন। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ভাগাভাগিসহ দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান অন্যান্য সমস্যারও সমাধান এ সময়ে আশা করা যায় না। তাই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণেরও পশ্চিমবঙ্গের পালাবদলকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
- বিজেপি
- বিধানসভা ভোট
