দুর্যোগ
বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে আর কত দেরি
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে
সৈয়দ ফারুক হোসেন
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ১৬:৫৯
বজ্রপাতে এক সপ্তাহে ৭১ জনের মৃত্যু প্রাণহানি ঘটেছে বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছ। বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জনের মতো মানুষ মারা যায়। চলতি বছরের চার মাস অতিবাহিত না হতেই মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। কিন্তু, বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল রোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প প্রণয়ন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও খুব একটা কাজে আসেনি।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটাসহ নানান কারণে বজ্রপাত বেড়ে গেছে, এতে মৃত্যুও বাড়ছে। প্রতি বছর শতশত কৃষক, প্রান্তিক মানুষ মারা যাচ্ছেন। প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে বজ্রপাত ইদানিং বেশ আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এবং প্রতিনিয়ত অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটছে ক্ষয় ক্ষতি ও প্রাণহানির দিক থেকে বিবেচনা করে বজ্রপাতকে নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন গবেষকরা। বজ্রপাতে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
বজ্রপাতে আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। হাওর, বাঁওড় ও বিল এলাকার জেলাগুলোয় বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি। ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলা মাঠ, নৌকা ও পথঘাটে যারা চলাচল করে তারাই এর শিকার। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের ঘটনা ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে। বজ্রপাতে একটি মৃত্যু হলে আরও অনেকেই আহত হন। অন্য দুর্ঘটনায় আহত আর বজ্রাঘাতে আহতের মধ্যে পার্থক্য আছে। এই দুর্ঘটনায় আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। সাধারণত এই দুর্যোগের শিকাররা সংশ্লিষ্ট পরিবারের সবচেয়ে কর্মক্ষম ব্যক্তি। মূলত জলবায়ু বৃদ্ধির কারণে এই দুটি দুর্যোগই বাড়ছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।আর প্রযুক্তি না থাকায় আগে থেকে পূর্বাভাস দিতে পারে না আবহাওয়া অধিদফতর।
এক্ষেত্রে কালো মেঘ দেখলেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।প্রকৃতির এ ভয়াবহ খেয়ালে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো প্রযুক্তি এখনো অপ্রতুল হওয়ায় মানুষকে জানানো সম্ভব হয় না। সাধারণত এপ্রিল মাসে যে মেঘের সৃষ্টি হয় সেখানে সব প্রায় মেঘেই বজ্রপাত থাকে। বজ্রপাত খুব জটিল তাই এগুলো আসলে আধাঘণ্টা বা একঘণ্টা আগে এর সম্পর্কে ধারণা দেয়া যায়। বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে।বর্ষার মৌসুমে মেঘের গর্জন হিসেবে পরিচিত ‘বজ্রপাত’ আমরা দেখতে পাই। বজ্রের গর্জন আর আকাশে চোখ ধাঁধানো স্ফুলিঙ্গ জানান দেয় বৃষ্টির বার্তা। ইদানিং কালে এই বজ্রপাত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়েছে।
আমাদের দেশে বজ্রপাতের শিকার মানুষদের বড় অংশ কৃষক, যারা সবার মুখে অন্ন তুলে দিতে মাঠে যান। আর সেখানেই মরে পড়ে থাকেন। পৃথিবীর বজ্রপাত প্রবণ অঞ্চলের একটি বাংলাদেশ। এ অস্বাভাবিকতার কারণ হচ্ছে বায়ুমন্ডলে কালো মেঘ বেড়ে যাওয়া। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বাড়াকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাত।বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে অসংখ্য মানুষ মারা যায়৷ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে যার পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন । বনের পরিমাণ এবং উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াকেও বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম এক কারণ ৷ বড় গাছগুলো আগে বিজলীর বিরুদ্ধে কাজ করতো৷ ফলে প্রাণহানি কম হতো৷প্রতিবছর বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায় তার এক-চতুর্থাংশ মারা যায় বাংলাদেশে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। দুঃখজনক সত্যটি হলো, বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কতগুল জরুরি নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। এরফলে জীবন রক্ষা পাওয়ার সম্বাবনা বেশী থাকবে । কিছু কিছু নিয়ম মেনে নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। বজ্রপাতের সময় এই সকল সচেতন মূলক বিষয় গুলো খেয়াল করে চললে প্রাণহানির সহ অন্যান্য ক্ষতি থেকে নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যসহ অন্যান্যদের রক্ষা করা সম্ভব।
বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে থাকা বিপজ্জনক। বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়া উচিত। সমুদ্র বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।যদি কেউ গাডির ভেতর অবস্থান করেন, তাহলে গাডি়র ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ রাখা যাবে না। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগে মানুষের মৃত্যুর হার যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যুর হার বজ্রপাতে। বজ্রপাতের ধর্ম হচ্ছে তা মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু যে জায়গাটি পায় সেখানে গিয়ে পড়ে। বৃক্ষহীন হাওর এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু থাকে। হাওর এলাকায় বজ্রপাত প্রতিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নিলে মৃত্যু কমবে।
সৈয়দ ফারুক হোসেন: সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি
