সমকালীন প্রসঙ্গ
পুলিশের ‘খাকি প্যান্ট’ নতুন বিতর্ক তৈরি করবে?
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ১১:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রুশ কথাসাহিত্যিক নিকোলাই গোগলের তৈরি চরিত্র আকাকির মতো এত আকুল হয়ে আর কে একটি নতুন পোশাক চেয়েছিল! বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প ‘শিনেল’ বা ইংরেজি অনুবাদে ‘দ্য ওভারকোট’-এ অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত পোশাক ঠিকই হয়েছিল। তবে সেটিই প্রতীকীভাবে এসেছিল সামান্য কেরানি আকাকির মৃত্যুর কারণ হয়ে।
আকাকির পোশাকের কথা মনে এলো বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের খবরটির সূত্র ধরে। যে পোশাক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে, যা ক্ষমতার প্রতীক, সে পোশাকের গুরুত্ব অনেক। তাই সে পোশাক নির্ধারণ প্রক্রিয়াও পরিকল্পিত ও নির্ভরযোগ্য হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের মেট্রোপলিটন পুলিশের শার্টের রং হবে হালকা জলপাই। অন্যদিকে এপিবিএন, এসপিবিএন, এসবি, সিআইডি এবং র্যাব বাদে পুলিশের অন্য সব ইউনিটের জন্য শার্টের রং নির্ধারণ করা হয়েছে গাঢ় নীল। তবে উভয় ক্ষেত্রেই প্যান্টের রং হবে খাকি (টিসি টুইল)। এই নতুন রূপরেখা কার্যকরে প্রয়োজনীয় আইনি বিধিমালা সংশোধনের খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। এখানেই দেখা দিয়েছে নতুন আশঙ্কা। নতুন পোশাকের জরিপের ফল পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না সিদ্ধান্তে। পুলিশ বাহিনীতে দুই লাখ ১২ হাজার সদস্য রয়েছে।
গত ২ ও ৩ মার্চ ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে কল্যাণ প্যারেডে অংশ নিয়েছেন মোট এক লাখ আট হাজার ৬৪১ জন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতে দেখা যায়, ৯৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ পুলিশ সদস্য আগের পোশাক নেভি ব্লু শার্ট-প্যান্ট এবং মহানগর এলাকায় সবুজ (গ্রিন) শার্ট ও গাঢ় প্যান্টের পক্ষে। দুই হাজার ৮১৭ পুলিশ সদস্য অন্য রঙের পোশাক চান। অর্থাৎ অধিকাংশ পুলিশ সদস্যের মত পুরোনো পোশাকের (২০২৫ সালে পরিবর্তনের আগের) পক্ষে। গত ৪ মার্চ পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানিয়েছে এসব তথ্য। কিন্তু পুরোনো পোশাকে প্যান্ট খাকি রঙের ছিল না। এবার হচ্ছে খাকি রঙের। ফলে এই যে অতৃপ্তিসমেত পরিবর্তন, এতে নতুন আশঙ্কা অমূলক নয়। আপাতত মেনে নেওয়া হবে বললেও পরে বলা হতে পারে, সিদ্ধান্তে অধিকাংশের মতামত প্রতিফলিত হয়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকার প্রেক্ষিতে বাহিনীটির সংস্কার আলোচনায় এসেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার একটি সংস্কার কমিশনও গঠন করে। একই সঙ্গে পুলিশের পোশাকেও পরিবর্তন আনা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোশাক পরিবর্তনেও পুলিশ কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, লৌহ (আয়রন) রঙের নতুন ইউনিফর্ম অন্য বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। রাতে দায়িত্ব পালনের সময় এটি দৃশ্যমান হয় না। নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাকের সঙ্গে পুলিশের এই পোশাক অনেক ক্ষেত্রে মিলে গেছে। দেশের আবহাওয়ার জন্যও পুরোপুরি উপযোগী নয়। তবুও সেই রঙের পোশাক পরতে হয়েছে পুলিশকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেই পোশাক নিয়ে আবার শুরু হয় আলোচনা। পুলিশের দুটি শীর্ষ সংগঠন– বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বর্তমান পোশাক পুনর্বিবেচনার দাবি জানায় ফেব্রুয়ারি মাসেই। কিন্তু ১৫ এপ্রিল পুলিশ সদরদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে প্রস্তাব করা হয়েছে খাকি রঙের প্যান্টের। ফলে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেমন পুলিশের মতামত উপেক্ষা করেই পোশাক পরিবর্তন হয়েছিল; প্যান্টের রং নিয়ে সেই বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
পোশাক পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত বিপুল ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিটি সেটের পেছনে আট থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। পুলিশের সোয়া দুই লাখ সদস্য প্রত্যেকের জন্য দুই-তিন সেট পোশাক তৈরি করতে হবে। তবে প্রতিবছর পুলিশ সদস্যদের যে খাত থেকে নতুন পোশাক দেওয়া হয়, সেখান থেকেই এবারের পোশাকের বরাদ্দ যাবে, বলা হচ্ছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হ্রাসের সুযোগ রয়েছে। যদিও এই সেদিন ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর মাঠ পর্যায়ে চালু করা পুলিশের পরিবর্তিত পোশাকের জন্য ব্যয় হয়েছিল ৭৬ কোটি টাকা।
দেশে পুলিশের পোশাকে বড় পরিবর্তন এসেছিল ২০০৪ সালে; মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রং, জেলা পুলিশের গাঢ় নীল রং হয়। র্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে। ২০০৯ সালেও কিছুটা পরিবর্তন আসে। তবে দৃশ্যমান বড় পরিবর্তন ২০০৪-এর পর ২০২৫ সালের পোশাকে।
পোশাকের এই বারবার পরিবর্তনের চেয়ে বরং পুলিশের সেবার মান ও পেশাগত উৎকর্ষ বাড়ানোয় জোর দেওয়া উচিত। যে যুক্তিতেই পোশাক পরিবর্তন হোক না কেন; গত অর্ধশতাব্দীতে পুলিশের আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন যে আসেনি, বলার অপেক্ষা থাকে না। গ্রামগঞ্জে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আলাদা কদর রয়েছে। সেটাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের নজিরও অপ্রতুল নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর হাতিরঝিলে একটি বাসার সামনে থেকে ছিনতাইয়ের সময় তিনজনকে আটকের পর জানা গিয়েছিল, তাদের একজন চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য। তারই নেতৃত্বে তিনজনের ছিনতাই দল তৈরি হয়েছে। চাকরিচ্যুত সেই সদস্যের কাছ থেকে পুলিশের ইউনিফর্ম, এক জোড়া অক্সফোর্ড শু, ট্র্যাকসুটসহ আরও কিছু জিনিস উদ্ধার করা হয়।
নিবন্ধটি শুরু হয়েছিল রুশ কেরানি আকাকির ওভারকোট দিয়ে। বিচারহীনতা, অপমান, গ্লানিতে আকাকির মৃত্যুর পর সে অশুভ আত্মা হয়ে পিটার্সবার্গের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কেড়ে নিচ্ছিল ধনীদের ওভারকোট। দীর্ঘদিন সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকা আমাদের পুলিশের ভেতরের কাঠামোতেও অশুভ আত্মা ভর করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের জন্য ব্রিটিশ আমলের খাকি প্যান্ট ফিরিয়ে আনা সমীচীন হবে কিনা, ভাবতে হবে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাহিনীর পোশাক নিয়ে বারবার বিতর্ক রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- পুলিশ
- পোশাক
