সাদা কালো
প্রতিহিংসার দেয়ালের ওপাশে আইনের শাসনের হাতছানি
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১৩:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর দেখে চমকেই উঠি। সাবেক এই মন্ত্রী কাগজ-কলমে এখনও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর এক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। তাঁর স্মৃতিশক্তি অনেকাংশেই লোপ পেয়েছে। সেই মানুষটির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা!
মঙ্গলবার সমকালের খবরে প্রকাশ, ২০০২ সালে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো (বর্তমান দুদকের পূর্বসূরি) মামলা করে। গত ১৯ এপ্রিল সেই মামলায় তোফায়েল আহমেদসহ দুজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আসামি পলাতক, তাই এ পরোয়ানা। প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়েছে, মঙ্গলবার ছিল এ মামলায় অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন। এদিন তোফায়েল আহমেদের অসুস্থতার কথা জানিয়ে তাঁর আইনজীবী আদালতের কাছে তোফায়েল আহমেদের মানসিক অবস্থা পরীক্ষার আবেদন করেছেন। তবে আদালত আবেদন নামঞ্জুর করে বৃহস্পতিবার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেন। এখন ওই পরোয়ানা তামিল করতে পুলিশ কি হাসপাতালেও হানা দেবে?
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের ক্ষেত্রে যারা অনন্য ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডাররা ছাড়াও তোফায়েল আহমেদসহ তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতাদের নাম স্মরণীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তোফায়েলের ভূমিকা বরাবরই অগ্রগণ্য। এসব কথা হয়তো আজকের রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রকদের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। বিশেষত গত দুই বছরে চোখের সামনে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক ভাঙচুর দেখেও তারা যেভাবে মৌন রইলেন; এমনকি কেউ কেউ অংশগ্রহণও করলেন, তাতে ওই ধারণাই পোক্ত হয়। স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে তোফায়েল আহমেদের অবিস্মরণীয় ভূমিকার কথা বলে গ্রেপ্তার থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই।
অভিযুক্ত মৃত্যুপথযাত্রী হলেও আদালত নিশ্চয় আইনি কারণেই তাঁর আইনজীবীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু অভিযুক্ত আসলেই মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম কিনা, তা পরীক্ষা করা হলে কিংবা তাঁর প্রতি একটু মানবিকতা দেখালে কি সেই আইন লঙ্ঘিত হতো? এখন কি মুমূর্ষু তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে যম-পুলিশে টানাটানি চলবে?
অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, গত বছর ২৭ মে আরেক অশীতিপর বৃদ্ধ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরাকে সস্ত্রীক শেরপুরের পুলিশ আটক করে। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল। ভিডিওতে ৮৫ বছর বয়সী প্রায় চলৎশক্তিহীন হীরাকে স্পষ্টত বেভোলা মনে হচ্ছিল। সম্ভবত তা নেটিজেনদের ক্ষুব্ধ করেছিল। জামালপুর সদর থানার পুলিশও স্বীকার করেছিল, ‘তার মানসিক অবস্থা ভালো না, সে কোথায় আছে তাও বলতে পারছে না’ (যুগান্তর, ২৭ মে ২০২৫)। সম্বোধনটা খেয়াল করুন, ‘তিনি’ নয়; ‘সে’। জামালপুরের বাসিন্দা এ সাবেক মন্ত্রী স্ত্রীকে নিয়ে শেরপুরে এসেছিলেন জমি বিক্রির দাপ্তরিক কাজ সারতে। সেখান থেকেই, শেরপুর সদর থানার বক্তব্য, মব সহিংসতা থেকে বাঁচাতে মন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীকে তারা থানায় নিয়ে আসেন। তবে শেরপুরের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইত্তেফাককে জানিয়েছিলেন, ‘সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীকে জামালপুর থানা পুলিশে সোপর্দ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে’ (ইত্তেফাক, ২৮ মে ২০২৫)। শেষ পর্যন্ত ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা’ বলে, ‘তাঁর বিরুদ্ধে মামলা না থাকায় ও বয়স বিবেচনা করে তাঁর স্ত্রী সালমা খাতুনের জিম্মায়’ মুচলেকা নিয়ে তাঁকে রাত ১১টার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এমন মানবিকতা কিন্তু অন্য দুই আওয়ামী লীগ নেতা রমেশ সেন ও নূরুল মজিদ হুমায়ুন পাননি। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ সেন গণঅভ্যুত্থানের পরপর ১৬ আগস্ট মধ্যরাতে ঠাকুরগাঁয়ে নিজ গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন। পরদিন তাঁকে দিনাজপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। হত্যাসহ তিন মামলায় অভিযুক্ত ৮৪ বছর বয়সী মানুষটি বারবার আবেদন করেও জামিন পাননি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

৭৫ বছর বয়সী সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদের মৃত্যুটি আরও করুণ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত পাঁচটি হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এক বছর তিনি বিনা বিচারে বন্দি ছিলেন, যেখানে সাধারণত তিন-চার মাসের মধ্যে বিচার শুরু না হলে এ ধরনের বয়স্ক অভিযুক্ত জামিনের অধিকারী হন। উপরন্তু তিনি নানা জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কারাগারে তিনি উপযুক্ত চিকিৎসা পাননি বলে তাঁর পরিবার অভিযোগ করেছিল। আরও ন্যক্কারজনক হলো, মৃত্যুকালেও তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো ছিল, যদিও ছবিটি পুরোনো– এ দাবি করে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক বলেছিলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তার স্বার্থে বন্দিকে চিকিৎসার সময় হাতকড়া পরিয়ে তা বিছানার সঙ্গে বেঁধে রাখতে হয়। অথবা হাতকড়া কোনো কারারক্ষীকে ধরে রাখতে হয়।’
আলোচ্য ঘটনাবলিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো আইন মেনেই চলেছে– এমন দাবি নিশ্চয় করা যাবে। কিন্তু সেটাকে আইনের শাসন বলে কিনা– সে প্রশ্ন তোলাই যায়। আইনের শাসন মানে শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগ নয়; অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের জন্য আইনি সুরক্ষাও বোঝায়। অভিযুক্তের জন্য আইনি সুরক্ষার মধ্যে যেমন অভিযুক্তের পক্ষ থেকে শর্তের ব্যত্যয়ের বড় কোনো শঙ্কা না থাকলে জামিন অন্তর্ভুক্ত, তেমনি সুচিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, আসামি যখন একজন বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি, তখন পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁর প্রতি সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের মানবিক আচরণ করাও আইনের শাসনের অন্তর্ভুক্ত।
আলোচ্য অভিযুক্ত সবাই যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তখন তাদের এ হেনস্তার পেছনে কেউ রাজনীতির গন্ধ পেলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি ক্ষমতাসীনদের আচরণ বরাবরই ছিল প্রতিহিংসাপূর্ণ– সন্দেহ নেই। সাংবিধানিক বিধান অনুসারে বিরোধী দলভুক্ত কোনো রাজনীতিক জামিনপ্রাপ্তির যোগ্য হলেও ক্ষমতাসীনদের যে কোনো উপায়ে তাঁকে আটকে রাখার অপকৌশল প্রয়োগের চেষ্টাও ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু ওইসব কারও জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষত অর্থনীতি ও সামাজিক স্থতিশীলতার জন্য যা নীরব ঘাতক; বরাবর লেগেই ছিল। আজ যখন ওই বিষাক্ত বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে তখন ওই প্রতিহিংসামূলক রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি দেশ ও জাতিকে আরও অন্ধকারে তলিয়ে দেবে।
প্রতিহিংসার রাজনীতির দেয়ালের ওপাশে এখনও তাই আইনের শাসন আকুল হাতছানি দিয়ে চলছে। সরকারের বোধোদয় ঘটুক; আইন ও আদালতকে নিজস্ব ধারায় চলতে দেওয়া হোক– আপাতত এটুকুই আশা।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
- আইনের শাসন
