ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

কোরবানির প্রস্তুতি

কোরবানির প্রস্তুতি
×

মো. শাহজাহান কবীর

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, সহানুভূতি; সর্বোপরি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহিমায় চিরভাস্বর কোরবানি। এ ইবাদত শুধু উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে নয়; বরং পূর্ববর্তী সব উম্মতের মধ্যেও জারি ছিল। 

কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য লাভ, সান্নিধ্য অর্জন, প্রিয় বস্তুকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য উৎসর্গ করা। শরিয়তের পরিভাষায়, নির্দিষ্ট জন্তুকে একমাত্র আল্লাহপাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত নিয়মে মহান আল্লাহর নামে জবেহ করাই হলো কোরবানি। 

সকল উম্মতের কোরবানির নিয়ম এক রকম ছিল না। শরিয়তে যে পদ্ধতিতে কোরবানি করা হয়, তাও আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশিত এবং তা মিল্লাতে ইবরাহিমির অংশ। সুরা কাউসারের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা কোরবানি আবশ্যক হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এরশাদ করেন, ‘তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো ও কোরবানি করো।’

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর মাদানি জীবনের প্রতিবছর কোরবানি করেছেন। কখনও কোরবানি পরিত্যাগ করেননি, বরং কোরবানি পরিত্যাগকারীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। যে পশুটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দেওয়া হবে, তা যেন নিখুঁত হয়। কোনোভাবেই দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত, ল্যাংড়া, কানকাটা, শিং ভাঙা এবং অন্ধ পশু কোরবানি করা বৈধ নয়।
হজরত আনাস (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ঈদে ধূসর রঙের শিংওয়ালা দুটি দুম্বা কোরবানি করলেন। তিনি সেগুলোকে নিজ হাতে জবাই করলেন এবং ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবর’ বলে জবাই দিলেন (বুখারি ও মুসলিম)। এ ছাড়া কোরবানির পশু খুব ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করা উচিত। ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে জবাই করে পশুকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়। 
জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত এই তিন দিন যে ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক– সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপার যে কোনো একটির সমপরিমাণ সম্পত্তির মালিক থাকবে, তার জন্য গরু, মহিষ, উট; এগুলোর একটা অংশ অথবা ছাগল, দুম্বা এসব পশুর একটি কোরবানি করা ওয়াজিব। গোশত খাওয়ার নিয়তে কিংবা মানুষ খারাপ বলবে, এটা মনে করে কোরবানি দেওয়া হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।

হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও স্বীয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) যে অবিস্মরণীয় ত্যাগ, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও আনুগত্যের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেই স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় ও পালনীয় রাখতে কোরবানির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। শুধু পশুর গলায় ছুরি চালানোয় কোনো পুণ্য নেই। বরং হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, দাম্ভিকতা, অবৈধ অর্থলিপ্সা, পরচর্চা-পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতাসহ যাবতীয় মানবীয় পশুত্বের গলায় ছুরি চালাতে পারলেই কোরবানি সার্থকতা বয়ে আনবে।
কোরবানির দিন পশু জবাইয়ের আগে পশুকে কষ্ট দেওয়া বা অন্য পশুর সামনে জবাই করা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সুন্দরভাবে জবাই করো এবং পশুকে কষ্ট দিও না।’ এটি ইসলামের দয়া ও মানবতার শিক্ষা বহন করে।

কোরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রেও ইসলাম সুন্দর নীতিমালা দিয়েছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে গোশত বিতরণ করা সুন্নত। এর মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। 
বর্তমান সমাজে কোরবানিকে অনেক সময় প্রতিযোগিতা ও অহংকারের বিষয়ে পরিণত করা হয়। কেউ বড় পশু কিনে গর্ব করে, আবার কেউ সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের চেষ্টা করে। অথচ ইসলামে অহংকারের কোনো স্থান নেই। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো বিনয়, ত্যাগ ও তাকওয়া অর্জন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।

ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

আরও পড়ুন

×