প্রাথমিক বিদ্যালয়
শিক্ষকশূন্যতা পূরণ অগ্রাধিকার হউক
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জামালপুর জেলার প্রায় অর্ধশত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকিবার খবরটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলি দীর্ঘদিন যাবৎ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়া চলিতেছে। তদুপরি, জেলায় সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রহিয়াছে ২৯৮টি। সহকারী শিক্ষকের অনুপস্থিতি হেতু পাঠদান কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটিতেছে। এদিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে যদ্রূপ প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক কার্য সম্পাদন করিতে হয়, তদ্রূপ শ্রেণি কার্যক্রমেও অংশ লইতে হয়। ফলে দাপ্তরিক কার্যে শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়; আবার শ্রেণি কার্যক্রম চালাইলে দাপ্তরিক কার্য বন্ধ হইয়া যায়। স্পষ্টত, বিদ্যালয়গুলি এক প্রকার ত্রিশঙ্কু অবস্থায় পড়িয়াছে। ইহার ফলে শুধু শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠ গ্রহণ হইতে বঞ্চিতই হইতেছে না শুধু; বহু শিক্ষার্থী ঝরিয়াও পড়িতেছে। বস্তুত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমন হাল শুধু জামালপুর নহে; সমগ্র দেশেই বিরাজমান। গত বৎসরের জুলাইয়ে এক সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছিল, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৬৫ সহস্রাধিক অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৪ সহস্রাধিক পদই শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নাই প্রধান শিক্ষক। তৎসহিত সাড়ে ২৪ সহস্র সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য।
জানা গিয়াছে, ২০১৮ সালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কতিপয় সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের মার্চ মাসের পূর্ব পর্যন্ত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বিবেচনায় লইয়া সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদেরই পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হইত। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা ঘোষণার ফলে বিভাগীয় পদোন্নতি বন্ধ হইয়া যায়। ফলে তখন হইতে প্রতিনিয়ত প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হইতে থাকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে।
এই সকল তথ্যের ভিত্তিতে যে কেহ সমস্যাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফসল বলিয়া ব্যাখ্যা করিতে পারেন। বাস্তবে উহার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেহেতু সমাজের সচ্ছল বা নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অভিভাবকের সন্তান মুষ্টিমেয়, তাই তাহাদের মধ্যে সংকট লইয়া উদ্বেগ না থাকা অসম্ভব নহে। অন্তত রাষ্ট্রের বহুবিধ সমস্যার মধ্যে, উহাদের বিবেচনায়, ইহার যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্তির সুযোগ নাই– এই কথা তো বলাই যায়। সাধারণভাবে জন্মলগ্ন হইতে এই রাষ্ট্রের পক্ষপাত সচ্ছল অংশের প্রতি– ইহা তো কাহারও অজানা নহে। সেই নীতিরই প্রভাব যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়িতেছে না– কে বলিতে পারে!
আমরা জানি, কয়েক বৎসর পূর্বে প্রায় সকল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণের ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই লেখাপড়া করে। এই শিক্ষার্থীদের প্রায় সকলেই সমাজের সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারভুক্ত। হলফ করিয়া বলা যায়, জামালপুরে উপরে বর্ণিত সংকটের কারণে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে আর্থিক বিচারে সমাজের নিচের ধাপের পরিবারের সন্তানেরা। ইহাতে ধনী-দরিদ্রের চিরাচরিত বৈষম্যও বৃদ্ধি পাইতেছে, যাহা সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধানের সহিত সাংঘর্ষিক।
এই সংকট অব্যাহত থাকিলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হইতে পারে;
এমনকি ভাঙিয়াও পড়িতে পারে, তাহা সকলকে মনে রাখিতে হইবে। তাই অবিলম্বে সকল শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক পদায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করিতেছি।
ইহা সত্য, সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কয়েক সহস্র সহকারী শিক্ষক নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে। কিন্তু নিয়মিত প্রধান শিক্ষক না থাকিলে সেই শিক্ষকদেরও দায়িত্বশীল করা যাইবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে সরকার মিড ডে মিল প্রবর্তন করিয়াছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ব্যাগ, পোশাক ও ফুটওয়্যার সামগ্রী বিতরণকার্যও শুরু হইয়াছে। এখন শিক্ষকশূন্যতার বিষয়কেও অগ্রাধিকাররূপে গ্রহণ করিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
