রাজনীতি
যা করুক সরকার, কেন জানানো দরকার?
খাজা মাঈন উদ্দিন
খাজা মাঈন উদ্দিন
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ১৩:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং তা বিদেশে পাচারের ফলে দেশের ব্যাংকগুলো যে ‘ফোকলা’ হয়ে গেছে, সে কথা শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, শুধু এ খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম দেখা ছাড়া। রুগ্ণ এসব ব্যাংকের সুস্বাস্থ্য কামনায় অর্থমন্ত্রী চাইলে বিশেষ সহায়তা (বেইল আউট) বরাদ্দ দিতেই পারেন আগামী বাজেট থেকে। তবে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদের মাধ্যমে এ দেশের জনগণকে জানাতে হবে করদাতাদের অর্থ ব্যাংক বাঁচাতে ব্যয় হলে কি ফেরত পাওয়া যাবে এবং সেটা কীভাবে ও কোন কালে?
প্রশ্ন আসে, মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ ‘দাম’ পরিশোধ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পাবে সাবেক স্পন্সররা; এ বিধান কতটা যৌক্তিক? সেখানে প্রদত্ত করদাতাদের ৩৫ হাজার কোটি টাকাও কি বাস্তবে তাদের অধিকারে চলে যাবে না? কৌতূহলী মানুষ জানতে চাইতেই পারে, শেখ হাসিনার শাসনামলে পাচার হওয়া শতাধিক বিলিয়ন ডলার ফেরত আসা শুরু হবে কবে? আরও এমন কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে যে ভবিষ্যতে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও অর্থ পাচার বন্ধ হবে?
দেশের মালিকদের অবশ্যই জানার অধিকার আছে– আগামীতে গঙ্গা নদীর পানি পেতে চুক্তি নবায়নসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে ভারতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আলোচনা কবে শুরু হবে বা সে বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি বা দিল্লির আশ্বাস কী। চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষিতে আমরা কীভাবে বঙ্গোপসাগরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তেল-গ্যাস উত্তোলনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারি, সে বিষয়ে নাগরিকদের আগ্রহ আছে।
তবে জাতি হিসেবে আমাদের ঠিক করতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসকরা প্রাধান্য দেবেন কীসে? সম্মিলিত স্বার্থ রক্ষায়, নাকি দু-চারজনের আখের গোছাতে? সাম্প্রতিক এক টকশোতে ‘ফর্মুলা’ দিয়েছেন এক নেতা: ‘রাজনীতি তো মানুষ বেনিফিটের জন্যই করে।’ সেই বিবেচনায় কোনো সরকারের নিজ থেকে কৈফিয়ত না দেওয়াটাই শ্রেয়। তবে ওই ভদ্রলোককে অনুসরণ করার বিন্দুমাত্র নৈতিক সুযোগ বা ঘোষিত ইচ্ছা কোনোটাই নেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের।
তারপরও নির্বাচিত সরকারের কারও কারও হয়তো নীরব জিজ্ঞাসা থাকবে– জনগণকে সব তথ্য জানিয়ে দিয়ে ‘খাল কেটে কুমির আনা’র মতো বিপদ ডেকে আনবে কেন তারা? আসলেই তো। সরকারের কী ‘ঠেকা’ পড়েছে নিজের সমালোচনার ইস্যুগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়ার! তাহলে সংবা মাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিরোধীদের কোনো কাজই থাকে না!
সুতরাং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম তৈরি বা পুনর্জাগরণে সহযোগিতা করা। উদ্দেশ্য: ভবিষ্যৎ গণমাধ্যমের যেন বড় বড় কাজের মধ্যে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে দ্বিধা না থাকে।
নিয়মকানুন প্রণয়ন, সেগুলো প্রয়োগ এবং মিডিয়ার লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা যেন প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়। আবার সত্যচ্যুত, ন্যায়নিষ্ঠাবিমুখ ও গণবিরোধী অবস্থার দিকে ঠেলে না নেয়। সে লক্ষ্যে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা যেতে পারে। সরকারের উচিত জনস্বার্থে প্রেস কাউন্সিলের এখতিয়ার বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে মিডিয়া কাউন্সিলে রূপান্তর এবং কেউ মিডিয়ায় রিপোর্টের কারণে সংক্ষুব্ধ হলে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
একই সঙ্গে সরকারি সংবাদমাধ্যম যেমন বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং তথ্য অধিদপ্তরকে আরও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি ও প্রকল্প এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণাগুলো মানুষের সামনে বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে উপস্থাপন করা যাবে। সে জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে ফ্যাসিবাদী জামানার অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দক্ষতার উন্নয়ন করতে হবে। যথাযথ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা, কার্যকর সরকারি মিডিয়া এবং সক্রিয়, বৈচিত্র্যময় বেসরকারি সংবাদমাধ্যম কার্যকর থাকলেও তথ্যপ্রবাহের সমস্যার পুরো সমাধান আসবে না, যদি সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত সুরক্ষা রাষ্ট্র ও সমাজে বলবৎ না থাকে। সাংবাদিকসহ যে কোনো নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকারের গ্যারান্টি দিতে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকা অপরিহার্য। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছে তথ্য কমিশন গঠন ও কার্যকর করা।
সর্ববিষয়ে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার পক্ষের কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হয়তো যুক্তি দেখাতে পারেন সরকারি আনুকূল্যে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দুর্নাম হয় এ রকম দলিল-দস্তাবেজ সরবরাহ করে সেধে কেন বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করব?

উল্টো প্রশ্নও করা যায়, কিছু ক্ষমতাসীন ব্যক্তির অপরাধ, দুর্নীতি ও বিচ্যুতি আড়াল করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকারের লাভ কী? বরং তাতে শীর্ষ নেতৃত্ব এবং ক্ষমতাসীন দলের ক্ষতিই কি বেশি নয়? আদর্শবাদী না হয়েও বলা যায়, সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বাড়ালে জবাবদিহির দায় কমে আসে। নইলে সব গোপন তথ্য ভবিষ্যতের জন্য জমে থাকে অথবা একসঙ্গে ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বা স্পর্শকাতর ইস্যুতে নিজে থেকে আগেভাগে ঘোষণা দিলে একটি রাজনৈতিক সরকার জনগণের আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেতে পারে।
বর্তমানে সে রকম বিষয়ের মধ্যে রয়েছে বাতিল হয়ে যাওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন, তথ্য অধিকার (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংস্কারের মতো ইস্যু।
বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ এসব অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী আইনে রূপান্তর করা হবে। শুধু ছোট্ট একটি কাজ করলেই এ বিষয়ে সন্দেহ আর সমালোচনার আগুন ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। এ আইনগুলো ঠিক কখন সংসদে উত্থাপন ও পাশ করা হবে এবং এগুলোতে কী কী নতুন বা যথোপযুক্ত ধারা সন্নিবেশিত হবে– তা বলে দিলেই উৎসুক জনতা শান্ত হবে; সমালোচকরাও হালে পানি পাবেন না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা দেশ ও দশের জন্যই শুধু কল্যাণকর নয়; সবচেয়ে লাভজনক হলো ক্ষমতাসীন দলের জন্য। কারণ এতে সহনশীলতা প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের ভুল সংশোধন এবং নেতৃত্বের পক্ষে জনগণকে বুঝিয়ে বলার সুযোগ থাকে সবসময়।
অন্যদিকে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়’ নীতির অর্থ দাঁড়ায়, কোনো অন্যায় কর্মকাণ্ড জনগণের দৃষ্টির বাইরে রাখার অসৎ চেষ্টা। একটি গণতান্ত্রিক সরকার ভুল করেও জনগণকে জানালে প্রকাশ পায় এর সৎ সাহস কিন্তু অন্যের মাধ্যমে জানাজানি হলে সরকার হয়ে পড়ে ‘আসামি’।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি নিশ্চয় প্রমাণ করতে চাইবে সরকার কীভাবে ৩১ দফা প্রস্তাব, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়ন করছে। বিএনপির দলীয় এবং জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিশ্রুতি পালন করা দেখলে জনগণ বিএনপির ওপর খুশি হবে; সন্দেহ রাখবে না। দিন শেষে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলকেও পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের দুয়ারে যেতে হয়।
খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
- বিষয় :
- খাজা মাঈন উদ্দিন
