ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
×

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ১১:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আজ কোনো আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বিশ্বের ৮৩০ কোটি মানুষের জীবনে মহাসংকট তৈরি করেছে। উন্নত, অনুন্নত সকল দেশের মানুষ ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে।

এই যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী ছিল? উত্তর–অবশ্যই না। বেশির ভাগ মানুষ যুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে তাদের কোনো মিত্র দেশের সহযোগিতা পায়নি। এমনকি ন্যাটো আজ ভাঙনের মুখে। কারণ ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য যুদ্ধে নিজেকে জড়াতে চায়নি।

বিশ্বের জ্বালানি তেলের ২০ ভাগ এবং এলএনজির এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয় ইরানের পার্শ্ববর্তী হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই পথ ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ। জ্বালানি তেল ও এলএনজির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী এ দুইয়ের দাম বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তেল ও এলএনজি প্লান্টের উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ায় এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর দ্বারা বাংলাদেশও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে জ্বালানি ও এলএনজি। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও বিপুল পরিমাণ এলএনজি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অন্যদিকে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য প্রতি ১০ ডলার মূল্যবৃদ্ধি মানেই মাসিক জ্বালানি আমদানির বিলে অতিরিক্ত ৭০-৮০ মিলিয়ন ডলারের বোঝা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের পরিবহন, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে। এর প্রভাবে পরিবহন ভাড়া বেড়ে নিত্যপণ্যের দাম যেমন বাড়ছে, তেমনি লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে কৃষি ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষিতে পর্যাপ্ত সেচ ও সারের ব্যবস্থা করতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ইতোমধ্যে ভাটি অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কৃষকের কষ্ট লাঘবের জন্য তিন মাসের জন্য কিছু ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে এমনিতেই বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতিতে আবার ঘি ঢালছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। এতে মূল্যস্ফীতি আবারও দুই অঙ্ক ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ও লোডশেডিং মানুষের কষ্টকে আরও অসহনীয় করে তুলছে। 

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের জন্যও এই যুদ্ধ দুঃসংবাদ। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় জাহাজের যাত্রা বিলম্বিত হয়। এর প্রভাবে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। বিজিএমই জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি তাদের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে, যা দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তারই ফলস্বরূপ দেশে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় দরিদ্রতা বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হলে দেশের সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা অনুমান করা বোধকরি খুব দুরূহ নয়। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের অন্যতম জায়গা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল ভিত্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, যার প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের মতো দেশ সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও আঞ্চলিক অস্থিরতায় তাদের অর্থনীতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে। এতে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। 

এই যুদ্ধ থেমে গেলে আমাদের দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পুনরায় মেরামত করতে বিপুল কর্মযজ্ঞ লাগবে। এ জন্য বিপুলসংখ্যক নির্মাণ শ্রমিকসহ অন্যান্য কর্মী দরকার পড়বে, যার জোগান বাংলাদেশ থেকে হতে পারে। আমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এখন থেকেই দক্ষ নির্মাণ শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে।  

দেশের কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে করে আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের হাতে বিকল্প পথ সীমিত থাকলেও কৌশলগত প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন–অফিস সময় ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত করা ও সন্ধ্যা ৭টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখা। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। আগামী আগস্ট মাস নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।

এগুলো আমাদের কিছুটা স্বস্তিতে রাখে বটে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে এসে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের জন্য বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং রপ্তানিপণ্য বৈচিত্র্যকরণের দিকে নজর দিতে হবে। এটি দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞজনেরা বলে আসছেন। এই সংকটময় মুহূর্ত থেকেই নতুন উদ্যোগে শুরু করতে হবে। 
 
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
 

আরও পড়ুন

×