ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

চিকিৎসা ব্যয়

রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যক্তির স্কন্ধে

রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যক্তির স্কন্ধে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মানুষকে যেইভাবে চিকিৎসার সিংহভাগ ব্যয়ভার স্বীয় ব্যবস্থাপনায় বহন করিতে হয়, উহাতে সংগতই প্রশ্ন উঠিয়াছে– স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের দায় কোথায়। শুক্রবার বিআইডিএসের গবেষণার তথ্য সমকালে প্রকাশ হইয়াছে, যেইখানে উঠিয়া আসিয়াছে, চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ব্যক্তির পকেট হইতে যাইতেছে। এমনকি দরিদ্র নাগরিকেরও মোট আয়ের ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় চলিয়া যায়। সংগত কারণেই ক্যান্সার কিংবা কিডনি রোগের ন্যায় দুরারোগ্য ব্যাধির বড় ব্যয়ের জন্য বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমায় নামিয়া গিয়াছে এবং অসংখ্য পরিবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রহিয়াছে। ফলে অসুস্থতা দেশে যদ্রূপ শারীরিক কষ্টের বিষয়, তদ্রূপ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ বটে। 

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ভার রাষ্ট্রের উপর হইতে বহুলাংশে সাধারণ মানুষের স্কন্ধে চাপিবার পরও হতাশাজনকভাবে, গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে, ৬৫ শতাংশ নাগরিকের উচ্চ ব্যয়সহ নানাবিধ কারণে তাহাদের চিকিৎসা চাহিদা পূরণ হয় নাই। চিকিৎসাবঞ্চিতদের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের অধিবাসীই অধিক। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনের তাগিদ রহিয়াছে, যাহাতে নাগরিকগণ চিকিৎসা লইতে গিয়া আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত না হয়। অথচ দেশের বাস্তবতা ভিন্ন, যাহা বিআইডিএসের আলোচ্য গবেষণাই সাক্ষ্য দিতেছে। 

দেশের সরকারি হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার সুযোগ থাকিলেও সেইখানকার সেবা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। প্রয়োজনের তুলনায় হাসপাতাল কম থাকিবার কারণে যথাসময়ে সেবা পাওয়া যায় না। এইখানে ঔষধের সংকট, পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অপ্রতুলতা রহিয়াছে। আইসিইউ সেবা কিংবা কিডনির ডায়ালাইসিসের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষ পায় না বলিলেই চলে। ফলে বাধ্য হইয়া তাহাদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যাইতে হয়। অথচ সেইখানে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাহিরে। জটিল রোগ দূরের কথা, মাঝারি ধরনের অসুস্থতায়ও বেসরকারি হাসপাতালে বিপুল অর্থ ব্যয় করিতে হয়। যেই কারণে অসুস্থ হইলেই অনেক মানুষের স্বীয় সঞ্চয় ভাঙা, জমি বিক্রয় কিংবা ঋণের উপর নির্ভর করা ব্যতীত গত্যন্তর থাকে না। অনেকে চিকিৎসা ব্যয় বহন করিতে না পারিয়া মৃত্যুঝুঁকিতে পতিত হয়। 

আমরা মনে করি, এই অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট হইতে উত্তরণে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির বিকল্প নাই। আমাদের জিডিপির হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায়ও এই বরাদ্দ অপ্রতুল। অথচ জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই বাস্তবতায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও মান বৃদ্ধি করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল, ঔষধ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করিতে হইবে। 

আমরা দেখিয়াছি, বর্তমান সরকার নির্বাচনের পূর্বে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। নাগরিকদের জন্য হেলথ কার্ড চালুর চিন্তাও করিতেছে সরকার। এইগুলি যেন শুধু প্রতিশ্রুতি হইয়া না থাকে। তৎসহিত ঔষধের বাজার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর তদারকি জরুরি।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে অস্বচ্ছতা ও বাণিজ্যিক মনোভাব সুস্পষ্ট। স্বাস্থ্য খাতকে কেবল ব্যবসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় ছাড়িয়া দিলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আরও সংকুচিত হইবে। স্মরণে রাখিতে হইবে, স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নহে, ইহা মানুষের অধিকার। তজ্জন্য মানুষ যাহাতে চিকিৎসা লইতে গিয়া নিঃস্ব না হয়– উহা সরকারকে নিশ্চিত করিতে হইবে। যাহার সূচনা হইতে পারে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে। এতদ্ব্যতীত হেলথ কার্ড ও স্বাস্থ্য বীমাও এই ক্ষেত্রে সহায়ক হইতে পারে। যেই সকল দেশ জনগণের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করিয়াছে, তাহাদের উদাহরণও পরখ করিয়া দেখা যাইতে পারে।

আরও পড়ুন

×