সমকালীন প্রসঙ্গ
রুনা লায়লাকেও যখন বলতে হয় ‘আমি মরি নাই’
রেজানুর রহমান
রেজানুর রহমান
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১১:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কী যে এক জটিল সময় পার করছি আমরা, নিজের মৃত্যুর খবর বেঁচে থাকতেই শুনতে হয়! প্রতিবাদ করে বলতে হয়– ‘আমি মরি নাই, বেঁচে আছি।’ উপমহাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তি সংগীত তারকা রুনা লায়লা স্বয়ং তাঁর মৃত্যুর গুজব সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি মরি নাই, সুস্থ আছি।’ একজন খ্যাতনামা সংগীতশিল্পীর জন্য এটা যে কত বড় অপমানজনক ও বিব্রতকর ঘটনা, তা বোধ করি অনেকেই উপলব্ধি করতে পারছেন।
মিনার-ই-দিল্লি পুরস্কার গ্রহণ করতে রুনা লায়লা দিল্লিতে যান। এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় হইচই, উত্তেজনা। দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী স্বয়ং রুনা লায়লার সঙ্গে যোগাযোগ করে আসল ঘটনা জানতে চান। নিজের মৃত্যু সংবাদ সম্পর্কে নিজেকেই নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সংবাদমাধ্যমে তিনি বলতে বাধ্য হন– ‘আমি ভালো আছি।’
রুনা লায়লা জানান, বিভিন্ন দেশ থেকে একের পর এক ফোন ও বার্তা পেয়ে তিনি বিস্মিত ও বিব্রত। সবার একই প্রশ্ন, তিনি ঠিক আছেন কিনা? মৃত্যুর মতো গুরুতর বিষয়ে এমন একটি ভুয়া খবর ছড়ানোর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রুনা লায়লা বলেছেন, এ ধরনের গুজব শুধু ব্যক্তিগত নয়, পরিবারের জন্যও গভীর মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে।
অতীতকালে নিজের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতেও দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। দৈনিক পত্রিকা ছিল খবরের একমাত্র উৎস। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দিনের পত্রিকা ঢাকার বাইরে পৌঁছাতে সময় লাগত দুই দিন। বর্তমান সময়ে দিনের পত্রিকা দিনেই যায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে দেশ-বিদেশের যে কোনো খবর বাতাসের আগেই ছোটে। ফলে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমের যে কোনো শাখায় সত্য-মিথ্যা খবর আপলোড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তেই তা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ‘ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ’– এ ধারণা প্রচলিত প্রচারমাধ্যমে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাড নিউজের কদর বেশি। ব্যক্তির সাফল্যের খবর যতটা না আলোচিত, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয় ব্যক্তির বিপর্যয়ের খবর। পরীক্ষায় সাফল্যের খবরে লাইক, কমেন্ট তেমন দেখা যায় না। কিন্তু পরীক্ষায় ব্যর্থতার খবরে লাইক, কমেন্টের দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যম এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থাকে প্রতিমুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ করে।
এখন ঘরে ঘরে ইউটিউব চ্যানেল। যার চ্যানেলে যত ভিউ তার নাকি তত আয়-রোজগার। ফলে আয় বাড়ানোর দৌড়ে টিকে থাকার জন্য মৃতপ্রায় মানুষকে না বাঁচিয়ে তাঁর করুণ মৃত্যুদৃশ্য ভিডিও করার প্রবণতা বেশ স্পষ্ট। একটা ভিডিওতে দেখলাম একজন পুরুষ একজন নারীকে বেদম প্রহার করছে। সম্পর্কে তারা স্বামী-স্ত্রী। দুপুরে ভাত রাঁধতে দেরি হওয়ায় স্বামী তাকে প্রহার করছে। এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে আপলোড হয়েছে। তার মানে, ঘটনার সময় অন্য কেউ ভিডিও করছিল। যে ভিডিও করছিল, স্পষ্টতই বোঝা যায় সে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনার ক্যামেরাপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। পরিকল্পিত ঘটনা না হলে যে ভিডিও করছিল, তার তো সেই নারীকে স্বামীর অত্যাচার থেকে উদ্ধার করার কথা। তা না করে সে যখন শুধু ভিডিও করছিল, তখনই ব্যাপারটা স্পষ্ট– এটি সাজানো নাটক। সাধারণ মানুষের মানবিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু অর্থ কামানোর চেষ্টা।
দেশ-বিদেশে একাধিক পক্ষ সেলিব্রিটিদের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলের ভিউ বাড়ানোর অপতৎপরতায় লিপ্ত। সবার নিশ্চয় মনে থাকার কথা– অভিনেতা, পরিচালক এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুর আগে কমপক্ষে তিনবার তাঁকে সামাজিক মাধ্যমে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন স্বয়ং শামসুজ্জামানকে বলতে হয়েছে– ‘আমি মরি নাই, বেঁচে আছি।’ জীবদ্দশায় এ বিষয়ে এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে আমার একাধিকবার কথা হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘কী একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার! অন্যের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েও মানুষ ব্যবসা করে। যে বা যারা এ ধরনের গুজব ছড়ায়, তারা কি মানুষ? জীবিত মানুষকে মেরে ফেলে তারা কি সত্যি স্বস্তিতে থাকে? তাদের কি পরকালের ভয় নাই?’
কঠিন প্রশ্ন। উত্তর দিতে পারিনি। এক অর্থে ভুয়া খবর প্রকাশ ও প্রচার একটা ব্যবসাও বটে। তাই বলে নীতি-নৈতিকতা থাকবে না! তথ্য যাচাই না করে একজন জীবিত মানুষের মৃত্যুর খবর প্রকাশ বা প্রচার করার আগে ভাবা উচিত, মৃত্যুই মানুষের শেষ ঠিকানা। এরপর সেই মানুষকে আর পাওয়া যাবে না। জীবিত অবস্থায় যখন কারও মৃত্যু সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ হয়, তখন ওই ব্যক্তির পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কী ধরনের মানসিক যন্ত্রণা শুরু হয়; কী ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা সহজেই অনুমেয়।
এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কার্যকর উদ্যোগ দরকার। যে কোনো প্রচার মাধ্যমের উচিত কারও মৃত্যুসংবাদ প্রচারের আগে খবরটি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া। মূলধারার অনেক প্রচারমাধ্যমও সবার আগে খবর প্রচারের ক্রেডিট নেওয়ার জন্য যাচাই-বাছাই না করেই মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে। এটা ঠিক নয়। পাশাপাশি ভুয়া মৃত্যুসংবাদের উৎস খুঁজে নিয়ে উৎসমুখ বন্ধ করা; শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও জরুরি।
আবারও বলি, ভিউ বাড়ানোর প্রত্যাশায় কারও মৃত্যুসংবাদ নিয়ে তামাশা করা উচিত নয়। মৃত্যু অনিবার্য ঘটনা। কিন্তু ভুয়া মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে যারা বিভ্রান্তি ছড়ায়, তারা আর যা-ই হোক, প্রকৃত মানুষ নয়। আসুন, আমরা প্রকৃত মানুষ হই।
রেজানুর রহমান: সাংবাদিক ও নাট্যকার
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
