ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ

হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় করণীয়

হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় করণীয়
×

মো. শহিদুল ইসলাম

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি প্রকৃতির এক অনন্য ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি। বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চল রূপ নেয় বিশাল জলরাশিতে। শুষ্ক মৌসুমে তা পরিণত হয় উর্বর ও উৎপাদনশীল কৃষিজমিতে। এই দ্বৈত চরিত্রের মধ্যেই গড়ে উঠেছে হাওরবাসীর জীবন ও জীবিকা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আকস্মিক বন্যা, অকাল বৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এই জীবনযাত্রা ক্রমশ ভয়াবহ রকম বিপর্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বোরো ধানই হাওর অঞ্চলের প্রধান ফসল এবং অধিকাংশ কৃষকের একমাত্র বা প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত। এ বছরও কৃষকরা অনেক প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে বোরো আবাদে ভালো ফলনের আশায় ব্যাপক পরিশ্রম করেছেন। হঠাৎ আগাম বন্যা ও অকাল বর্ষণের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল পাকার আগে পানির নিচে তলিয়ে যায়, যা তাদের জন্য এক বড় ধাক্কা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, কৃষক মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। ফলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি জীবিকার মূল ভিত্তিও দুর্বল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই কঠিন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর জন্য তিন মাসের সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও মানবিক উদ্যোগ। তবে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের বিষয়ও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়া অত্যাবশ্যক।

হাওর অঞ্চলের জীবন ও জীবিকার টেকসই উন্নয়নে কিছু কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, বসতভিটা উঁচু করা অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। একই সঙ্গে উঁচু প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বহুমুখী কমিউনিটি শেল্টার নির্মাণের বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে, যা জরুরি আশ্রয়, খাদ্য সংরক্ষণ ও পশুপালনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
দ্বিতীয়ত, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হাওর অঞ্চলে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগোপযোগী ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যুৎ সংযোগ অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকায় সৌর প্যানেলভিত্তিক ‘সোলার হোম সিস্টেম’ ব্যবস্থা চালু করলে ঘরে আলো জ্বালানো, মোবাইল ফোন চার্জ, ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনা ইত্যাদি আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্ভব হবে। পাশাপাশি সেচের ক্ষুদ্র ব্যবস্থাপনা, মাছ চাষ কিংবা শীতলীকরণ ব্যবস্থার মতো কার্যক্রমেও সৌরশক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। 

তৃতীয়ত, বাড়ির আঙিনা বা উঁচু স্থানে গৃহস্থালি বাগান (হোমস্টেড গার্ডেনিং) গড়ে তোলা যেতে পারে, যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে কিছু অতিরিক্ত আয়ও করা সম্ভব হবে। চতুর্থত, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য ও সময়ের দাবি। মাছ ধরা, হাঁস পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং হস্তশিল্পের মতো কার্যক্রমকে পরিকল্পিতভাবে উৎসাহিত করা গেলে কৃষির ওপর একক নির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং ঝুঁকি বিভাজন সম্ভব হবে। 
হাওর অঞ্চলের উন্নয়নকে একটি সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। শুধু কৃষি খাত নয়; অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা– সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, মানসম্মত শিক্ষা বিস্তার এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা আরও কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হবে। হাওরবাসীর জীবন প্রকৃতির সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ এবং এই সম্পর্কই তাদের সংস্কৃতি, সমাজ ও অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলেছে। 

মো. শহিদুল ইসলাম: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচার
[email protected]

আরও পড়ুন

×