সমাজ
গ্রামীণ বাংলার সামাজিক রূপান্তর কোথায় দাঁড়িয়ে
সেলিম জাহান
সেলিম জাহান
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ১০:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘গ্রাম ও শহরের মধ্যে সম্পর্ক হইবে অন্দরবাড়ী ও বহির্বাড়ীর মতো। বহির্বাড়ীতে সব বাহিরের কাজকর্ম হইবে, কিন্তু কর্মশেষে আরাম এবং শান্তির জন্যে ফেরত যাইতে হবে অন্দরবাড়ীতে।’
মনে রাখা দরকার, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম-শহরের এই সম্পর্ক বদলেছে। সে বদল মূলত গ্রামীণ সমাজের রূপান্তর। কেমন হয়েছে সে পরিবর্তন– ভালো না মন্দ? কোথায় কোথায় হয়েছে সে বদল? গ্রামবাংলার সামাজিক রূপান্তরের প্রবণতা ও পরিবর্তন বুঝতে হলে তাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখা প্রয়োজন।
সুদূর অতীতে ‘স্বনির্ভর গ্রাম’ ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গ্রামের নানান জনগোষ্ঠী নানান কাজ করে পুরো গ্রামের চাহিদা মেটাতেন। বিনিময় প্রথার দ্বারা পারস্পরিক চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চক্রের দ্বারা ‘স্বনির্ভর’ গ্রামীণ অর্থনীতির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। সামাজিক দিক থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় থাকত। যেমন কামারপাড়া, তাঁতিপাড়া ইত্যাদি।
দারিদ্র্য, অভাব, অসমতা সে কাঠামোতে অবশ্যই ছিল। কিন্তু সব ছাপিয়ে মানুষে মানুষে মানবিক সম্পর্কের কারণে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব ছিল। তাই ধর্মীয় ব্যবধান থাকলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পারস্পরিক অংশগ্রহণ ছিল সর্বজনীন। মানুষে মানুষে সম্পর্কই ছিল সামাজিক সুরক্ষার সবচেয়ে বড় বন্ধন।
এই ‘স্বনির্ভর’ অর্থনীতিতে প্রথম চিড় ধরে অর্থের অনুপ্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে; সামগ্রী ও সেবার পারস্পরিক বিনিময় প্রথা দুর্বল হয়ে যায়। তবে আমাদের দেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোতে বিরাট ধাক্কা আসে তেতাল্লিশের মন্বন্তর, বিশেষত সাতচল্লিশের দেশভাগের ফলে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চুরমার হয়ে যায়। দাঙ্গার ফলে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ফেলে উদ্বাস্তু হয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যায়।
এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রচুর অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, সেখানে অনুগামী শ্রেণি সৃষ্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্প্রসারণ ও সুদৃঢ়ীকরণের প্রথম কাজটি করেছিলেন আইয়ুব খান ষাটের দশকে। তাঁর ভৌতিক অবকাঠামো কর্মসূচি, বুনিয়াদি গণতন্ত্র ব্যবস্থা ও ‘উন্নয়নের দশক’ সে লক্ষ্য সামনে রেখেই পরিচালিত হয়েছিল। উন্নয়নের নামে এ দেশের গ্রামীণ সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংস, মূল্যবোধ নষ্ট ও দুর্নীতির জন্ম হয়েছিল।
ষাটের দশকে গ্রামীণ জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল ‘ট্রানজিস্টর রেডিও’। এর ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংযোগ তৈরি হয়। গ্রামের মানুষের বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা অনুষ্ঠান শোনার সুফল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লাভ করা গিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের গ্রামবাসী যে যত্ন ও দরদ দিয়ে শহুরে মানুষদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়েছিল, তা অবর্ণনীয়। গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদেরও আশ্রয় দিয়েছে এবং বিপুল সংখ্যায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এ কারণে পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচার ও নৃশংসতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গ্রামগুলো। ফলে মুক্তিযুদ্ধকালে গ্রামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়; জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে; ভৌত অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন গ্রামবাংলার অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। সে লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কৃষিতে সমবায় প্রথা প্রচলনের ওপরে জোর দেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেন। গ্রামবাংলার পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সহায়ক ভূমিকা পালন করে দাতাগোষ্ঠী ও বেসরকারি সংস্থাগুলো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল প্রভৃতি সামাজিক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব সহযোগীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে গ্রামীণ জীবনে সামাজিক সেবার অবকাঠামো গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখে।
আশির দশকে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ অদক্ষ শ্রমশক্তি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে থাকে। এর ফলে একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কাজ করার বদলে যে করেই হোক মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার একটা হিড়িক পড়ে যায়। অন্যদিকে রেমিট্যান্সের ভিত্তিতে গ্রামীণ জনজীবনে আর্থসামাজিক বিভাজন প্রকট হয়।
আশির দশকেই পোশাকশিল্পের অভ্যুত্থান ও বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামাঞ্চল থেকে হাজার হাজার নারী শহরে চলে এসে পোশাকশিল্পে নিয়োজিত হয়। ফলে গ্রামীণ সমাজে তিনটি কাঠামোগত রূপান্তর ঘটে। এক, নারীরা গ্রামীণ আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দুই, জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান একটি নতুন মাত্রিকতা ও স্বীকৃতি লাভ করে। তিন, নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের ফলে প্রজনন হারের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আশির দশকেই গ্রামাঞ্চলে মূলত নারী-অভিমুখী ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার অভূতপূর্ব বিস্তার হয়। পরে গ্রামাঞ্চলে মোবাইল ফোনের বিস্তারে নারী উদ্যোক্তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে নারীরাও অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে শুরু করে।

আশির দশকের শেষের দিকে গ্রামাঞ্চল রাস্তাঘাটসহ ভৌত অবকাঠামোর প্রচুর উন্নয়নের কারণে গ্রামগুলো শহরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতিময়তার সৃষ্টি হয়। নব্বই দশকের শেষের দিকে ইতিবাচক নীতিমালার ফলে কৃষি ও খাদ্যলভ্যতার ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন হয়, তাতে গ্রামীণ আয়ের ক্ষেত্রে উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যায়। প্রত্যাশিত গড় আয়ু, শিশুর মৃত্যুহারসহ নানান সামাজিক সূচকে ভারত, পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশীর তুলনায় এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
মোবাইল ফোন, আন্তঃযোগ ও নানান সামাজিক মাধ্যমের অভ্যুদয়ের ফলে আমাদের গ্রামীণ সমাজ আজ শুধু বৃহত্তর দেশজ নয়; বরং বৈশ্বিক সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত। এর ফলে কতগুলো কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে আমাদের গ্রামীণ সমাজে। এক, নগর ও গ্রামের সীমারেখা অনেক হালকা হয়ে এসেছে। দুই, গ্রামাঞ্চলের যুবকদের মধ্যে নগরাঞ্চলে চলে যাওয়ার অভিপ্রায় অনেক বেড়েছে। তিন, নতুন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপ্তির কারণে গ্রামে শহুরে, এমনকি বৈশ্বিক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ফলে চিরায়ত গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন– যাত্রা, নৌকাবাইচ, হাডুডু ইত্যাদির প্রচলন কমে এসেছে। ‘মোবাইল ব্যাংকিং’-এর মতো প্রযুক্তির সূচনা ও ব্যবহার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতিময়তা দিয়েছে।
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে কতগুলো সংকটের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা নগর-পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ায় বহু ক্ষেত্রেই গ্রামীণ অগ্রাধিকার উপেক্ষিত। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ সমাজের বহু মূল্যবোধ ও অনুশাসনে ইতিবাচক রূপান্তরে দৃষ্টি না দেওয়ায় বাল্যবিয়ে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। তৃতীয়ত, গ্রামীণ সমাজে মুক্তচিন্তা কিংবা বিজ্ঞানমনস্কতা সুদৃঢ় হতে পারেনি। বরং ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা এবং নারীর বিরুদ্ধে আক্রমণ বেড়েই চলেছে।
চতুর্থত, নানান সময়ে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে সমস্যাই শুধু বিকেন্দ্রীকৃত হয়েছে; কিন্তু সমাধানের কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। গ্রামীণ সমাজে পরিবর্তনের গতিময়তা সৃষ্টির জন্য যে ধরনের বিকেন্দ্রীকৃত আর্থিক ও মানবসম্পদের বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা হয়নি।
পঞ্চমত, যে কৃষি খাত গ্রামীণ জীবনের জীবনরেখা, সেটা দশকের পর দশক অবহেলা আর উপেক্ষার শিকার হয়েছে সরকারি নীতিমালা আর অর্থায়নের ক্ষেত্রে। যে কারণে কৃষিতে বিনিয়োগ এখনও কম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল। কৃষকের পণ্যমূল্য ও আয়ের নিরাপত্তা নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক নাজুকতায় এই খাতের ক্ষতি বেশ বড়।
শেষের কথা বলি। সময়ের পথ ধরে গ্রামবাংলার সমাজে নানান রকম রূপান্তর ঘটেছে– তার কিছু ইতিবাচক, কিছু ইতিবাচক নয়। চিরায়ত গ্রামবাংলা আমরা কখনও ফিরে পাব না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বর্তমানের বাস্তবতার নিরিখে এবং ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে একটি ভবিষ্যৎ দিগ্দর্শন নিয়ে নব উদ্যমে আমরা গ্রামবাংলাকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারব না।
ড. সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
