ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবেশ-প্রকৃতি

মেঘচুরি ও ভবিষ্যতের পানিযুদ্ধ

মেঘচুরি ও ভবিষ্যতের পানিযুদ্ধ
×

মইনুল হাসান 

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ১৪:৪৪

অ্যাজটেক সভ্যতায় তেলালোক ছিল বৃষ্টি, জল এবং পার্থিব উর্বরতার দেবতা। বৃষ্টি এবং ফসলের ভালো ফলনের জন্য দেবতার তুষ্টি লাভের আশায় নরহত্যার রেওয়াজ ছিল। দেবতার উদ্দেশ্যে শিশুদের অগ্নিদগ্ধ করার সময় অমানুষিক যন্ত্রণা দেওয়া হতো। কারণ, জলের দেবতা শিশুদের চোখের জলও খুব পছন্দ করত। এ ছিল অ্যাজটেকদের ধর্মীয় বিশ্বাস।

এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য মানুষের আকুতি আগেও ছিল, আজও আছে। বিগত বছরগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাপদাহ মানুষসহ অন্য জীবদের জীবন দুর্বিষহ করেছিল। ইরাক এবং কুয়েতের বহু স্থানের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ইউরোপ, আমেরিকার বন-জঙ্গল পুড়ে উজাড় হয়েছিল। বাংলাদেশও আগুনের হল্কা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। একটানা তাপদাহ জনজীবনকে বিষিয়ে তুলছে। জলবায়ু, পৃথিবীর আয়ু মেপে লালকার্ড দেখিয়ে দিয়েছে।

আজকের দিনে মানুষ যখন চাঁদে, মঙ্গলগ্রহে স্থায়ী বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পৃথিবী নামক এই গ্রহের ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ কথাটি অন্যভাবে বলা যায়, প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ পিপাসা মেটায় দূষিত পানি পান করে। ইউনিসেফ আমাদের আরও ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক তথ্য জানাচ্ছে, অনিরাপদ পানীয় জল এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধির কারণে সৃষ্ট রোগে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ হাজার ৩০০-এরও বেশি শিশু মারা যাচ্ছে।

পানির অভাব মেটাতে বা বাড়তি পানির জন্য ইতোমধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৫০টি দেশ আকাশের মেঘের প্রতি হাত বাড়িয়েছে। মেঘের স্বাধীন চলাচলে বাগড়া দিচ্ছে। যেখানে বৃষ্টি নামার কথা নয়, প্রযুক্তি খাটিয়ে সেখানে বৃষ্টির পানি নামিয়ে নিচ্ছে। যেখানে মরুভূমি থাকার কথা, সেখানে ফুল-ফল আর শস্যের ক্ষেত, নির্মল পানির নহর। যেখানে সবুজ অরণ্যে, পশু-পাখির সঙ্গে মানুষের আবাস ছিল, সেখানে কারবালার বিষাদ সিন্ধু, জলহীন রুক্ষ প্রান্তরে পরিণত হচ্ছে। মহা উদ্বেগের এমন তথ্যই আমাদের জানিয়েছে ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের অন্যতম পত্রিকা ‘লু তম’। 

এই মেঘ কোথা থেকে আসে? কোথায় যায়? এমন প্রশ্নের উত্তর পরিবেশবিদ এবং বিজ্ঞানীদের আজ আর অজানা নেই। তবে এই মেঘের মালিকানা কার? অতীতে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন কেউ কোনোদিন তুলেছে বলে মনে হয় না। অথচ আজকের দিনগুলোতে এই প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। কারণ, এই মেঘের মধ্যে লুকিয়ে আছে অমূল্য সম্পদ, এই সম্পদের নাম হচ্ছে ‘মিঠাপানি’। মানুষের জীবন ধারণের জন্য পানি অপরিহার্য। পানির কোনো বিকল্প নেই। অথচ পৃথিবীতে দিন দিনই সুপেয় পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অথচ এর চাহিদা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পানিদূষণের মাত্রাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বহু দেশ, নগরীর মানুষেরা তাদের চাহিদা মাফিক পানের যোগ্য পানি পাচ্ছে না। সেচের পানির অভাবে দুর্ভিক্ষ দরজায় কড়া নাড়ছে। পানির অভাবে মানুষের মৃত্যু বাড়ছে। পানি নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কাড়াকাড়ি, হানাহানি শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেছে।

বেশি দূরে যেতে হবে না, আমাদের বাংলাদেশের কথাই বলা যায়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি আন্তসীমান্ত নদী রয়েছে। এই নদীগুলোর পানিপ্রবাহ ভারত নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের দখলে নেবার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে মরণ ফাঁদ ফারাক্কা বাঁধের কথা আমরা জানি। পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি এই বাঁধ ভাটির দেশ বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে যতই আমরা ‘ভারত আমাদের বন্ধু’ বলে মুখে ফেনা তুলি, তাতে করে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের দুর্ভোগ হ্রাস পাবে না। আন্তসীমান্ত নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং দখল নিয়ে পৃথিবীর বহুদেশে এমন বিরোধ, টানাপোড়েন চলছে। কারণ পানি দুর্লভ হয়ে উঠছে।

বহু দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বহু নিচে নেমে গেছে। স্পেনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে লবণ আলাদা করে পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। ঢাকা, নয়াদিল্লি, কাবুল, জাকার্তা, পিকিং, মেক্সিকো সিটি, এথেন্স, সাও পাওলো, ইত্যাদি জনবহুল মেগাসিটিগুলোতে ইতোমধ্যে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। 

আজ সে কারণেই কিছু কিছু দেশ আকাশের মেঘ চুরির প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে এগিয়ে আছে চীন। সেই ১৮ বছর আগে ২০০৮ সালে অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলাকালীন পিকিং নগরীর তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে, সে সময়ে মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে চীনা প্রযুক্তিবিদরা বেশ দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। তবে চীন যে শুধু বৃষ্টি নামিয়ে পিকিং নগরীতে উত্তপ্ত জীবনে কিছুটা প্রশান্তির এনেছিল, তা-ই নয়, ‘স্কাই রিভার’ বা ‘আকাশ নদী’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৩ সাল থেকে তিব্বত মালভূমিতে হাজার হাজার কামান বসিয়ে আকাশের মেঘের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে রাসায়নিক। গন্তব্যে পৌঁছাবার আগেই মেঘ তখন বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে চীনা ভূখণ্ডে। চীন প্রতি বছর ৫ হাজার ৫০০ কোটি টন কৃত্রিম বৃষ্টির পানিতে ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটারে বিশাল এলাকাকে সিক্ত করছে। সেখানে এখন সবুজের ছড়াছড়ি। আকাশে মেঘ থেকে বৃষ্টি নামাতে চীন সবার শীর্ষে।

চীনের দেখাদেখি মরুভূমি ঠেকাতে, উত্তাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য অনেক দেশ মেঘ থেকে বৃষ্টির পানি উৎপাদন প্রকল্পে উৎসাহী হচ্ছে। মরুভূমির দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবও বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০২২ সালে দ্য ইকোনমিস্ট জানিয়েছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে বিশ্বের অন্যতম শুষ্ক এই দেশটিকে সুজলা-সুফলা করার বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সে দেশের আকাশে জলবাহী মেঘের আনাগোনা শুরু হলেই আগে থেকে প্রস্তুত বিমানগুলো আকাশের উড়ে গিয়ে সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দিয়ে মেঘ থেকে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামিয়ে নেয়।  

এদিকে ২০১৮ সালে ইরানের এক সামরিক কর্মকর্তা তাঁদের দেশে একাংশে অনাবৃষ্টির কারণ দেখিয়ে, ইসরায়েলকে ‘মেঘ চুরির’ অভিযোগে অভিযুক্ত করে। শুধু ইসরায়েলকেই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্কের বিরুদ্ধেও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে তোলে। তবে যারা আবহাওয়া এবং জলবায়ুর খবর রাখেন, তাঁরা ইরানের অভিযোগকে পাত্তা দিচ্ছেন না। কারণ তাঁরা এমন কোনো প্রমাণ পাননি। 

আকাশের মেঘ ইচ্ছা মতো দখল করে নেবার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে করে প্রশ্ন উঠছে যে এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক কোনো বিধিনিষেধ বা আইন আছে কিনা? মেঘ নিয়ে কারসাজি করার বিষয়ে সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা চুক্তি নেই। ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের উত্থাপিত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় শত্রুতা বা সামরিক উদ্দেশ্যে পরিবেশ পরিবর্তনের যে কোনো উদ্যোগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চুক্তিটি ১৯৭৮ সাল থেকে কার্যকর করা হয় এবং এ চুক্তিটির প্রতি সম্মতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, রাশিয়াসহ এ পর্যন্ত মোট ৭৮টি দেশ চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা ফোর্বস বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এ চুক্তিটি মেঘ তস্করদের নিবৃত্ত করতে যথেষ্ট কার্যকর নয়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোন মেঘের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে সরিয়ে এমন সুপেয় পানি আহরণকে আরও সহজ করেছে। ফলে পরিবেশবিদরা এ নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। তাঁদের মতে, এটি পরিবেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই জলচক্রের বিঘ্ন ঘটাতে যে সকল চক্র জড়িত, তাঁদের থামাতে হবে, যে কোনো উপায়ে বন্ধ করতে হবে ‘মেঘ চুরি’।

ড. মইনুল হাসান : ফ্রান্স প্রবাসী লেখক
[email protected]

আরও পড়ুন

×