ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

টিভেট, চীন ও আমাদের ‘ঘুঁটা’ উন্নয়ন

টিভেট, চীন ও আমাদের ‘ঘুঁটা’ উন্নয়ন
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ১১:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাং লাদেশের শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করেছেন, আমরা এখনও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ (টেকনিক্যাল, ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেইনিং-টিভেট) খাতের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে। বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষ মানুষ তৈরিতে দক্ষ শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে।

তবে প্রশ্ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের এই উদ্যোগ কি বৃহত্তর কোনো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ, নাকি বিচ্ছিন্ন একটি প্রকল্প হতে যাচ্ছে? আমরা যদি টিভেট কার্যক্রমকে শিল্পনীতি, প্রযুক্তি কৌশল, গবেষণা, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত না করে শুধু শিক্ষক প্রশিক্ষণ দিই, তাহলে সেটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।

চীনের অভিজ্ঞতাও আমাদের সেই দিকটা বুঝতে সহায়তা করে। সেখানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তর কৌশলের অংশ। তাদের টিভেট রাতারাতি শক্তিশালী হয়নি। তারা বিদেশি প্রশিক্ষক এনে বা কয়েকটি প্রকল্প চালু করে শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়নি। বরং শিক্ষা, শিল্পনীতি, প্রযুক্তি, স্থানীয় উৎপাদন ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে একসঙ্গে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকেই রূপান্তর করেছে।

১৯৪৯ সালে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার সময় দেশটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দরিদ্র ও কৃষিনির্ভর। প্রথমেই তারা গণসংহতি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে দুই দশকে তারা শিক্ষা, সাক্ষরতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা গড়ে তোলে। একই সময়ে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার ফারাক সঠিকভাবে অনুধাবন না করতে পারায়, বিশেষ করে সঠিক তথ্যের অভাবে ১৯৫৮-৬২ সালের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচিতে তাদের বড় মাশুলও দিতে হয়। এই অভিজ্ঞতা চীনকে বুঝিয়ে দেয়– শুধু রাজনৈতিক উদ্দীপনা বা শর্টকাট দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রশাসন ও উৎপাদনকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হয়।

তাই ১৯৮০-এর দশক থেকে চীন পরিকল্পিতভাবে ছাত্র, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও গবেষকদের বিদেশে পাঠানোর পাশাপাশি দেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গবেষণা অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। অর্থাৎ শিক্ষা ছিল বৃহত্তর জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। পরবর্তী ৩০ বছরে তাদের পরিকল্পনার ফল দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ফলে চীন ‘বিশ্ব কারখানা’য় পরিণত হয়। 

আর বাংলাদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কখনেও বিদেশি মডেল কপি করে, কখনেও নতুন প্রকল্পের নামে কোর্স চালু করে, যে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা কাজ খুঁজে পায় না। শিল্পকারখানার দক্ষতা উন্নয়নকে যুক্ত না করায় প্রশিক্ষণ হয়, কিন্তু উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। তদুপরি এক সরকারের প্রকল্প পরের সরকার বাদ দিয়ে নতুন প্রকল্প শুরু করে। 

চীন, সিঙ্গাপুর কিংবা জাপান এই ভুল করেনি। তারা বুঝেছিল, রাষ্ট্র গঠন রেললাইনের মতো সমান্তরাল খাত দিয়ে হয় না। এটি অনেকটা মৌচাকের মতো। শিক্ষা, শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রশাসন সব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। অথচ আমাদের দেশে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো প্রায়ই আলাদা পথে চলে। সমন্বয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে থাকে না।

একটি সমস্যার সমাধানে আমরা যেন স্যালাইন তৈরির মতো এক চিমটি পরিকল্পনা, এক মুঠো অর্থ আর প্রচারণার ‘ঘুঁটা’ দিয়ে দ্রুত কিছু একটা করে দেখানোর চেষ্টা করি। প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থ নষ্ট করে সভা ও বিদেশ সফর হয়। একসময় সব আগের জায়গায় ফিরে যায়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি কোনো তাৎক্ষণিক প্রকল্প নয়। এটি ২৫ থেকে ৪০ বছরের ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিষয়।

চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে অভিযোজন। তারা পশ্চিমা মডেল অন্ধভাবে নকল করেনি। নিজেদের অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও শিল্প চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করেছে। কোথাও ভারী শিল্প, কোথাও ইলেকট্রনিকস, কোথাও টেক্সটাইল, কোথাও কারিগরি প্রশিক্ষণ। সবকিছু আবার পরস্পর যুক্ত ছিল।

বাংলাদেশে টিভেটকে মূলধারার বাইরে রাখা হয়। অভিভাবকদের বড় অংশ মনে করে, টিভেট মানে কম মেধাবীদের জায়গা। নিজের মেধাবী সন্তানকে তারা টিভেট থেকে দূরে রাখেন। আরেকটি বাস্তবতা হলো, আমরা দীর্ঘদিন মূলত সস্তা শ্রম রপ্তানির দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আগামী পৃথিবীতে শুধু কম মজুরির শ্রম দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও রোবটিক্সের যুগে কম দক্ষ শ্রমের চাহিদা কমতে পারে। তখন টিকে থাকবে দক্ষতা, প্রযুক্তি জ্ঞান ও অভিযোজন সক্ষমতা।  জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন বা সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে, একটি দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন  জনশক্তির ওপর।

সুতরাং চীনের সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেই প্রশিক্ষণকে আমরা কোন জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করছি; আমাদের শিল্পনীতি কী; কোন খাতে আগামী ২০ বা ৩০ বছরে কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই; প্রযুক্তি হস্তান্তরের রোডম্যাপ কী– ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে? এমন অনেক প্রশ্নের যথাযথ উত্তরের ওপর নির্ভর করবে আমাদের সাফল্য। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত সম্পদের ঘাটতি নয়, বরং সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার অভাব।

আমরা দ্রুত ফল চাই। ৫ বছরের মধ্যে একটা কিছু  দেখিয়ে পরের নির্বাচনে জয়ী হতে চাই। কিন্তু গোঁজামিল দিয়ে রাষ্ট্র চলে না কিংবা চলা উচিতও নয়। ইতিহাস বলে, কোনো রাষ্ট্রের সক্ষমতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। চীন সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে কয়েক দশক ধরে যত্ন ও পরিচর্যা করে চারা গাছ থেকে আজ মহিরুহ। আমাদের নীতিনির্ধারকদেরও এই বাস্তবতা বুঝতে হবে।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×