ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জুলাই সনদ এবং সংবিধান বিতর্ক

জুলাই সনদ এবং সংবিধান বিতর্ক
×

শেখ নাহিদ নিয়াজী

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ১৯:৫৯

বাংলাদেশ এখনও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা এখন আর শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি লিখিত জনরায়। যদিও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৩তম সংসদ তার মেয়াদে থিতু হয়েছে, তবুও এক গভীর পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ এখন ‘জুলাই সনদ’-এর বৈধতা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রাতিষ্ঠানিক আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে এক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করছে। এই উত্তেজনা সুস্পষ্ট, এবং এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পথচলা এক ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টা। 

২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশ এক তীব্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার বৈশিষ্ট্য হলো সাংবিধানিক সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত সংস্কারগুলোর বৈধতা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে একটি সংস্কার প্যাকেজ অনুমোদিত হয়েছে, কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে– তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য বিরোধ রয়ে গেছে।    

একদিকে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সহ নবনির্বাচিত বিরোধী দলগুলো ফেব্রুয়ারির গণভোটে ৬৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থনপুষ্ট জুলাই সনদকে একটি মুক্ত রাষ্ট্রের ভিত্তিগত ‘সর্বোচ্চ সংবিধান’ হিসেবে দেখে। তাদের কাছে সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব কোনো পরামর্শ নয়; এগুলো শহীদদের রক্তে স্বাক্ষরিত একটি ‘সামাজিক চুক্তি’র শর্তাবলি। তারা প্রধানমন্ত্রীর জন্য ১০ বছরের মেয়াদসীমা এবং একটি পৃথক সচিবালয়সহ সত্যিকারের স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান আইনে প্রোথিত ‘স্বৈরাচারী ডিএনএ’র অবিলম্বে বিলোপ দাবি করে।

বিএনপি জুলাই সনদের স্বাক্ষরকারী ছিল, ওয়েস্টমিনস্টার-শৈলীর সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার বাস্তবতা এক নতুন সতর্কতার জন্ম দিয়েছে। সরকারি দলের আইন বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন যে, ১৯৭২ সালের সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে বহাল রয়েছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সংবিধানটি বাস্তবায়নের জন্য ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ– যা সংশোধনের নির্ধারিত পদ্ধতি– এড়িয়ে যাওয়া হলে তা ‘অধ্যাদেশের মাধ্যমে শাসন’-এর এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে, যা সম্ভবত সেই স্বৈরাচারী শাসনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে, যার অবসান ঘটাতে চেয়েছিল জুলাইয়ের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন।

এই অচলাবস্থা নিছক একটি আইনগত তর্কাতর্কি নয়। এটি প্রত্যাশার সংকট। বিএনপির যুক্তি হলো স্থিতিশীলতা: তারা জোর দিয়ে বলছে, যে কোনো সংস্কার অবশ্যই সংসদীয় সংশোধনের ‘সাংবিধানিক পথ’ অনুসরণ করবে। 

কিন্তু ‘জুলাই প্রজন্ম’-এর (অর্থাৎ সেইসব ছাত্র ও আন্দোলনকর্মী যারা গুলির মুখে দাঁড়িয়েছিলেন) কাছে এটি একটি কালক্ষেপণের কৌশল বলে মনে হচ্ছে। তারা যুক্তি দেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান ‘কলুষিত’ এবং জনগণের দ্বারা অনুমোদিত জুলাই সনদের একটি ‘অতি-সাংবিধানিক’ (সুপ্রা-কনস্টিটিউশনাল) ম্যান্ডেট রয়েছে, যা পুরোনো নিয়মকানুনকে অতিক্রম করে। তা ছাড়া যে কোনো বিলম্বকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক পার্লামেন্ট বয়কট এবং এনসিপির নতুন করে রাজপথে আন্দোলনের ডাক একটি ক্রমবর্ধমান হতাশারই প্রতিফলন: যদি গণভোটের মাধ্যমে পাওয়া জনরায় একটি ত্রুটিপূর্ণ সংবিধানকে অগ্রাহ্য করতে না পারে, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য কী ছিল?

তবে সরকারের ‘সাংবিধানিক প্রক্রিয়া’র ওপর জোর দেওয়াটা একটি প্রয়োজনীয় অবলম্বন। অবিরাম বিপ্লবের ওপর ভিত্তি করে কোনো রাষ্ট্র গড়া যায় না। বর্তমান রাজনৈতিক চক্রের পরেও সংস্কারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে, সেগুলোকে স্বচ্ছ ও সংসদীয় উপায়ে দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে গেঁথে দিতে হবে। এখন চ্যালেঞ্জটি হলো এই যে, ১৯৭২ সালের সংবিধান– যা ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত বা সংহত করার জন্য বারবার সংশোধিত হয়েছে– সেটিই সেই হাতিয়ার, যা অতীতের শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।

ফেব্রুয়ারির গণভোটটি একটি সেতুবন্ধ হওয়ার কথা ছিল। ‘বিপ্লবী বৈধতা’ থেকে ‘সাংবিধানিক বৈধতা’য় উত্তরণটি বিপজ্জনক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।  
নতুন সরকার, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও, এমন এক সতর্কতা অবলম্বন করছে, যা প্রায় দ্বিধার পর্যায়ে চলে গেছে। বর্তমানে আমাদের রাজনৈতিক আলোচনাকে অচল করে দেওয়া বিতর্কটি একটি গুরুতর প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে– অন্তর্বর্তীকালীন ঐকমত্যের ভিত্তিতে খসড়া প্রস্তুত করা এবং গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত একটি দলিল বিদ্যমান সংবিধানকে কি বাতিল করতে পারে?

এখানে বিপদটি হলো একটি সংস্কার অচলাবস্থা। যদি সরকার জুলাই সনদকে নবনির্বাচিত সরকার বা তার কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং সাধারণ জনগণ সরকারের এই সতর্কতাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখে, তবে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। অবশ্যই জনগণ অতীতের সেই ‘শূন্য ফলাফল’ রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারে না।
এই অচলাবস্থার ঝুঁকি কেবল তাত্ত্বিক নয়। এই অনিশ্চয়তা আগে থেকেই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলছে। বিশ্বব্যাংক কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে এবং তারা অপেক্ষা করছে শেষ পর্যন্ত কোন ধরনের নিয়মকানুন দেশটিকে শাসন করবে তা দেখার জন্য। এদিকে রাজপথ আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতাদের নেতৃত্বে একটি ১১ দলীয় জোট এই এপ্রিলে দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছে এবং সরকারকে ‘জুলাই চেতনার’ সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করেছে। 

 কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় শাসন নিশ্চিত করার জন্য সামনের পথে একটি বৃহৎ সমন্বয় বা আপস প্রয়োজন। আর তা করতে হলে, সরকারকে তার ‘ভিন্নমতের নোট’ (নোট অব ডিসেন্ট) থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই দুটি দলিলের মধ্যে সেতুবন্ধ করার জন্য একটি সময়সীমাযুক্ত ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’ গঠন করতে হবে। সংসদ যদি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, তবে আমরা একটি ‘সনদকৃত সংবিধান’ (চার্টার্ড কনস্টিটিউশন) পাব না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসনকে স্বীকার করতে হবে যে ২০২৬ ফেব্রুয়ারির ম্যান্ডেট শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্য ছিল না, বরং নেতৃত্বের প্রকৃতির পরিবর্তনের জন্য ছিল। ‘জুলাই সনদ’ সেই রক্ষাকবচ, যা সরকারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার প্রলোভন থেকে রক্ষা করবে।

বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনশীল অবস্থায় রয়েছে। কারণ এটি টেকসই ও জবাবদিহিমূলক কিছু করার চেষ্টা করছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা বা ম্যান্ডেটকে ক্ষুণ্ন না করে স্বৈরতন্ত্র থেকে একটি স্থায়ী কার্যকর গণতন্ত্রে রূপান্তর করাই হলো এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

১৩তম সংসদকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে এর ম্যান্ডেট দ্বৈত– এটি বর্তমানকে শাসন করার জন্য নির্বাচিত হয়েছিল; আবার জুলাই সনদের মাধ্যমে একে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। জুলাই সনদকে উপেক্ষা করা মানে অস্থিতিশীলতাকে আমন্ত্রণ জানানো; সংবিধানকে উপেক্ষা করা মানে বিশৃঙ্খলাকে আমন্ত্রণ জানানো। সংসদের নির্বাচিত নেতাদের অবশ্যই এই দুটিকে একীভূত করা এবং কোনো বিলম্ব ছাড়াই বিদ্যমান সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার মতো ন্যায়-নীতিবোধ, সাহস ও প্রজ্ঞা থাকতে হবে।
 
শেখ নাহিদ নিয়াজী: স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক 
[email protected] 

আরও পড়ুন

×