ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

হামে শিশুমৃত্যু রোধে সমন্বিত উদ্যোগ কোথায়?

হামে শিশুমৃত্যু রোধে সমন্বিত উদ্যোগ কোথায়?
×

মুশতাক হোসেন

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১১:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইতোমধ্যে দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্তের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে হামের ‘সন্দেহজনক’ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজারে। এর মধ্যে সাত সহস্রাধিকের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত। এই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৩৯ জনের। এর মধ্যে ৭০ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত ছিল। আক্রান্ত ও মৃত প্রায় সবাই শিশু। আমার জানামতে, বাংলাদেশের মতো এত শিশুমৃত্যু পৃথিবীর কোথাও হয়নি। 

প্রতিবছর শিশুরা হামের টিকা পায়, যা তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। তবে কিছু শিশু টিকা গ্রহণের বাইরে থাকে। ফলে এসব শিশুর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। এ ধরনের শিশু সমাজের জন্যও রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে। কারণ তারা রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার উৎস হিসেবে কাজ করে। এর ফলে সম্প্রদায়ে জনগোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। যখন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক শিশু টিকা পায় না, তখন সাধারণত নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগও বড় আকারে রূপ নিতে পারে। 

টিকা গ্রহণ না করা শিশুদের কারণে রোগের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নতুন প্রজন্মও ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এ ছাড়া এই অবস্থায় রোগের পুনরাবির্ভাব বৃদ্ধি পায়, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাই শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্য নয়; সমাজের স্বাস্থ্য এবং রোগ নিয়ন্ত্রণেও সকল শিশুকে সময়মতো টিকা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমরা ৫৯ মাস পর্যন্ত টিকা প্রদানের সময় বহাল রাখতে পারি, যাতে ধাপে ধাপে গণটিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে সব শিশুর টিকা নিশ্চিত হয়। 

অতীতে করোনার মধ্যে টিকা কার্যক্রম সফল হয়নি। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে টিকাবিরোধী তৎপরতাও দেখা গেছে। এসব প্রভাব বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। হামের এই প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে এটি বৈশ্বিক কারণ। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল প্রদানের সঙ্গে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র তহবিল বন্ধ করে দেওয়ায় টিকা প্রদান ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া অসংখ্য টিকা কর্মীর বেতন এই তহবিলের সঙ্গে যুক্ত। এগুলো বৈশ্বিক কারণ হলেও অভ্যন্তরীণ কারণ অবশ্যই রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা হলো, শিশুমৃত্যু ঠেকাতে না পারা। চিকিৎসাক্ষেত্রে আমরা কিছু হোঁচট খেতেই পারি। কিন্তু গোড়ার সমস্যা হলো, আমাদের চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যবস্থা। 

আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু সে তুলনায় কোনো কিছুর পরিবর্তন ঘটছে না। এই চিকিৎসা জটিলতার কারণে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমছে কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠী যথাযথ চিকিৎসা লাভে ব্যর্থ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সিটি করপোরেশনের অধীন হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেলসহ অন্যান্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালে খাবারসহ অন্যান্য সুবিধার গুণগত মান বাড়াতে হবে। কারণ, তারা এমনিতেই অপুষ্টিতে ভোগে। বিশেষত সংক্রমণপ্রবণ জায়গা, বস্তিতে বসবাসরত শিশুদের জন্য দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা থাকতে হবে– মাঝারি বা সেকেন্ডারি হাসপাতাল, যেখানে প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো রয়েছে। অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সদস্যদের আলাদা রেখে যত্ন করা যায়। এতে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমে আসবে। 

গ্রামীণ পর্যায়ে এ অবস্থা আরও প্রকট। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বল চিকিৎসার কারণে গ্রামের মানুষ ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হয়। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে তারা স্থানীয় কমপ্লেক্স কিংবা সদর হাসপাতালে সেবা পেলে এই সংকট তৈরি হতো না। বর্তমানে হামের সংকটেও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। অথচ বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে। যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে আইসিইউর অভাবে আজকেও কেন শিশুরা মারা যাচ্ছে?

চিকিৎসাক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, আইসিউ সংকট। আইসিইউ ছাড়া যে অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে, তা সংখ্যায় যথেষ্ট নয়। তা ছাড়া এগুলো খুব কেন্দ্রীভূত। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এসব সুবিধা সমানভাবে পায় না। এ কারণে মৃত্যুহার সব রোগের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে প্রাইভেট হাসপাতালের আইসিইউ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। যে কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দুটোই বেশি। পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ওয়ার্ডেই তারা চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়। এতে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়, যা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে। এ ছাড়া আইসিইউ সংকটের কারণে হাসপাতালে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ বৃদ্ধি পায়। মহামারি বা বড় ধরনের সংক্রমণকালে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

বাস্তবতা হলো, শুধু হামের ক্ষেত্রে নয়, পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে এবং বিকেন্দ্রীকরণ না হলে জনবান্ধব চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না। 

ডা. মুশতাক হোসেন: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
 

আরও পড়ুন

×