ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

গঙ্গা ব্যারাজ: কারিগরি বিধান এবং কূটনৈতিক বিধেয়

গঙ্গা ব্যারাজ: কারিগরি বিধান এবং কূটনৈতিক বিধেয়
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১০:৫৯ | আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ | ১৮:১৬

গত ১৩ মে ‘একনেক’ বা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর থেকে এর পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবী মহল ছাড়িয়ে জনসাধারণের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। নিজেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ‘তাৎক্ষণিক’ মতামত প্রকাশ করেছি। এ ছাড়া চলতি বছরই ‘গঙ্গা ব্যারাজের ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি’ শীর্ষক নিবন্ধে এর প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছি (সমকাল, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬)। গভীরে গেলে দেখা যায়, পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের জমিন আসলে ভিন্ন। এক পক্ষ যখন ব্যারাজকে দেখছে কূটনৈতিক বিধেয় হিসেবে, তখন অপরপক্ষের বিধানগুলো মূলত কারিগরি।

ক. কারিগরি বাস্তবতা
এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, বৃহৎ ড্যাম বা ব্যারাজ এমনকি সেতুও নদীর স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশে এর আগে নির্মিত কাপ্তাই ড্যাম, তিস্তা ব্যারাজ, মনু ব্যারাজ, যমুনা সেতু ও পদ্মা সেতু বিভিন্ন মাত্রায় নদীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি তো করেছেই। এমনকি ভারতের যে ব্যারাজের ‘প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, সেই ফারাক্কা ব্যারাজও কেবল ভাটিতে নয়, উজানেও নদীর স্বাস্থ্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় পাঁচ দশকের পরিক্রমায় ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে গঙ্গার ভাটি বা বাংলাদেশ অংশ যে ভালো নেই, তা খালি চোখেই ধরা পড়ে। পানিশূন্যতা, ভাঙন জাগানিয়া চর, মৎস্য সম্পদহীনতা, ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগতি, শাখা নদীগুলোর দুরবস্থা, সেচ ব্যবস্থায় ধস, আরও ভাটিতে সুন্দরবনে মিঠাপানির সংকট, লবণাক্ততার বাড়াবাড়ি– সব মিলিয়ে গঙ্গা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশ ভালো নেই। 

ফারাক্কার উজানের অংশের পরিস্থিতি নিয়ে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ২০১৬ ও ১৭ সালেই বলেছিলেন, ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে ফেলা হোক। কারণ, নদীভাঙন ও বন্যা ছাড়া ব্যারাজটির আর কোনো ‘উপযোগিতা’ নেই। পশ্চিমবঙ্গের নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র সেই নব্বইয়ের দশক থেকেই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছিলেন– ফারাক্কা ব্যারাজ অকেজো হয়ে পড়তে পারে। ‘গঙ্গা ভাঙন কথা’ বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ভাঙতে ভাঙতে গঙ্গা পাগলা দিয়ে মহানন্দা হয়ে ফারাক্কা এড়িয়ে পুরোনো পথে প্রবাহিত হতে পারে। ২০০৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনেও আশঙ্কা করা হয়েছিল, ফারাক্কার উজানে পাগলা ও গঙ্গার ব্যবধান এক কিলোমিটারে ঠেকেছে।

২০১৬ সালের জুন মাসে আমি সমকালের জন্য কল্যাণ রুদ্রের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানেও তিনি বলেছিলেন, গঙ্গা-পাগলার মিলনের আশঙ্কা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের নথিতেই ব্যক্ত হয়েছিল; বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শাসনামলে। সেই মিলন ঠেকাতে ভারত যদিও বিপুল অর্থ ব্যয় করছে; ব্যবধান কমছে বৈ বাড়ছে না। বলা বাহুল্য, একই ভূগোলের আরও ভাটিতে বাংলাদেশে নির্মিতব্য গঙ্গা ব্যারাজের ক্ষেত্রে ফারাক্কার মতো ভৌগোলিক প্রতিক্রিয়া বা ঝুঁকি আরও বেশি। ভাটিতে ঝুঁকি বেশি। কারণ বঙ্গীয় ব-দ্বীপের যত ভাটির দিকে যাওয়া যায়, সেখানকার ভূমিরূপ তত নবীন ও নাজুক। 

যে কোনো ব্যারাজ বা ড্যামের মতো ফারাক্কারও বড় চ্যালেঞ্জ পানি নয়, পলি ব্যবস্থাপনা। বিশেষত গঙ্গা যখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান পলিবাহী নদী। নদীটি বছরে কমবেশি সাতশ মিলিয়ন টন পলি বহন করে। ব্যারাজের কারণে উজান ও ভাটিতে স্রোত মন্থর হয়ে পড়ায় এর তিনশ মিলিয়ন টনই ফারাক্কার উজানে জমা। উচ্চতা বাড়ছে গঙ্গাবক্ষের। এমন পরিস্থিতির অনিবার্য ফল পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যে প্রবল ভাঙন। 

ফারাক্কার কারণে মন্থর স্রোতের পলি জমে জমে গঙ্গার বাংলাদেশ অংশেও গত কয়েক দশকে ভাঙনের মাত্রা প্রতিবছর বাড়ছে। বাংলাদেশ অংশে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মিত হলে এর উজানের ১৬০ কিলোমিটার অংশেও ভাঙন বাড়বে বৈ কমবে না। ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে ইতোমধ্যে নদীটি বেয়ে বঙ্গোপসাগরে যাওয়া পলির পরিমাণ কমেছে। গঙ্গা ব্যারাজ নির্মিত হলে বঙ্গোপসাগরমুখী পলির স্রোত দ্বিগুণ মাত্রায় হ্রাস পাবে। তার মানে, ব-দ্বীপের নতুন ভূমি গঠন প্রক্রিয়ার যে আশীর্বাদ বাংলাদেশ আবহমান কাল থেকে পেয়ে আসছে, সেটা হ্রাস পাবে। নদীবাহিত পলির আশীর্বাদেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার যে প্রাকৃতিক শক্তি বাংলাদেশের রয়েছে, সেটাও কমে আসবে।

এ ছাড়া ব্যারাজ তৈরি হলে মৎস্য সম্পদ আহরণও কমে আসবে। যেমন ব্যারাজের কারণে ইলিশ মাছ এখন ফারাক্কার উজানে যেতে পারে না; তেমনই ভবিষ্যতে ইলিশ মাছ গঙ্গা ব্যারাজের উজানে যেতে পারবে না। অবধারিতভাবে গঙ্গানির্ভর নৌ চলাচল ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এটা সত্য, পরিবেশগত এসব বিষয় বিবেচনাতেই সম্ভবত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত ব্যারাজে পানি প্রবাহের জন্য ৭৮টি স্পিলওয়ের পাশাপাশি পলি প্রবাহের জন্য ১৮টি ‘আন্ডার স্লুইসগেট’ এবং ২টি ‘ফিসপাস’ রাখা হয়েছে। কিন্তু কাগজ-কলমের কারিগরি নকশার এসব ‘সুফল’ বাস্তবে যে পুরোপুরি পাওয়া যায় না– সেটা তিস্তা ও মনু ব্যারাজে প্রমাণিত। ফারাক্কা ব্যারাজেও এসব সুফল কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে ব্যারাজের কারণে জীবিকা হারানো জেলেরা ২০১৪ সালে ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল ৩ হাজার ২২৬ কোটি রূপি ক্ষতিপূরণের দাবিতে।

খ. কূটনৈতিক ব্যবস্থা
চলমান বিতর্কে একটি পক্ষের যুক্তি, গঙ্গা ব্যারাজের কারিগরি ব্যবস্থাপনা যেহেতু কঠিন ও ঝুকিপূর্ণ; গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার সমাধান হওয়া উচিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ ব্যবহারের মাধ্যমে। কূটনৈতিকভাবে দেখলে, ফারাক্কা ব্যারাজ চালুই হয়েছিল বিশ্বাসভঙ্গের মধ্য দিয়ে; ২১ দিনের ‘পরীক্ষামূলক পরিচালন’ স্থায়ীভাবে অব্যাহত রাখার মাধ্যমে। আর ৫০ বছরের মধ্যে ১৫ বছর কোনো চুক্তিই ছিল না। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ এই ডিসেম্বরে শেষ হলে নবায়ন যে সহজ হবে না– সেই লক্ষণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট। 

আর অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশের অধিকার সম্পর্কিত যে দুটি জাতিসংঘ রক্ষাকবচ রয়েছে, এর মধ্যে ১৯৯২ সালের পানি কনভেনশনটি বাংলাদেশ গত বছর জুনে স্বাক্ষর করেছে এবং ১৯৯৭ সালের পানিপ্রবাহ কনভেনশনের অনুস্বাক্ষর ঝুলিয়ে রেখেছে। মুশকিল হচ্ছে, যদি কনভেনশন দুটি বাংলাদেশ স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর সম্পন্ন করেও; সুফল পেতে হলে ভারতকেও কনভেনশন দুটিতে স্বাক্ষর করতে হবে। এটা ঠিক, ভাটির দেশ এ ধরনের কনভেনশন স্বাক্ষর করলে আন্তর্জাতিকভাবে নীতিগত সহায়তা ও সমর্থন মেলে। কিন্তু তাতেও উজানের দেশ থেকে পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা মেলে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছি ‘জাতিসংঘ পানি সনদ: নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারিক প্রশ্ন’ নিবন্ধে (সমকাল, ৪ মে ২০২৫)।

এ ছাড়া গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে আরেকটি কূটনৈতিক উপায় হতে পারে গঙ্গা অববাহিকার অপর দেশ ও ভারতেরও উজানে অবস্থিত নেপালের সঙ্গে ‘স্যান্ডুইচ জোট’ বাঁধা। কিন্তু নেপাল কি এতে সম্মত হবে? বাকি থাকে পারস্পরিক নির্ভরতার ইস্যুগুলো ‘ট্রেড অফ’ করা। হতাশাজনকভাবে, গত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশ সেটা করতে পারেনি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছি ‘গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছর’ শীর্ষক নিবন্ধে (সমকাল, ১ জানুয়ারি ২০২৬)। তার মানে, গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ক কূটনীতি বহুলাংশে নির্ভর করছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ধরনের ওপর। 

যারা শুধু কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছেন, তাদের জন্য প্রশ্ন হচ্ছে– যদি দুই দেশের সম্পর্ক গঙ্গা চুক্তির নবায়নে ইতিবাচক না হয়; যদি নেপাল ‘স্যান্ডুইচ জোট’ গঠনে রাজি না থাকে; যদি জাতিসংঘ কনভেনশন দিয়ে পানি আদায় না হয়; যদি পারস্পরিক নির্ভরতার ইস্যুগুলো ‘ট্রেড অফ’ করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশ কী করবে?

গ. কারিগরি বিধান ও কূটনৈতিক বিধেয়
গঙ্গা ব্যারাজের কারিগরি বাস্তবতা এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক ব্যবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বিধেয় ও কারিগরি বিধান তাহলে কী? ক্ষুদ্র বিদ্যা ও বুদ্ধিতে আমি যতদূর বুঝি, বাংলাদেশের সামনে তিনটি পথ রয়েছে। 

প্রথমটি নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক উপায়গুলোর সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; সেটা ভারতসহ ভারতের উজানের দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন থেকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্ভাব্য সবরকম রক্ষাকবচ প্রস্তুত রাখায় বিশেষ জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিকল্প নেই। যেমন খোদ ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ প্রকল্পটির নাম সাড়ে ছয় দশক পরে এসে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ করার মতো অবিমৃষ্যকারিতা করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে ইতোমধ্যে লিখেছি, “প্রস্তাবিত ব্যারাজ বিষয়ে পুনর্মূল্যায়িত প্রকল্পে ‘গঙ্গা’ নদীর নাম জোর করে ‘পদ্মা’ রেখে কী লাভ হবে জানি না। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে উজানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবাহিত নদীতে বাংলাদেশের যে অববাহিকাভিত্তিক অধিকার, সেটাকে যেচে খর্ব করা হচ্ছে। যে কারণে ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে কলকাতার পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীটিকে ভারতের পক্ষে যদিও ‘গঙ্গা’ বলা হয়, আমরা সেটাকে আসল নাম ‘ভাগীরথী’ হিসেবেই ডাকি। কারণ ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত ধারাটিই আসল গঙ্গা। এটার নাম ‘গঙ্গা’ বলেই উজানে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ হয়ে উত্তরাখণ্ডের যে দেবপ্রয়াগে অলকানন্দা ও ভাগীরথী মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে গঙ্গা নাম ধারণ করেছে, সে পর্যন্ত অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশের অভিন্ন অধিকার আমরা দাবি করতে পারি” (সমকাল, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬)।

দ্বিতীয়ত, ছোট-বড় সব রকম প্রতিবেশী দেশেরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পারস্পরিক নির্ভরশীলতা থাকে। বাংলাদেশের যেমন উজান থেকে পানি দরকার, ভারতেরও তেমন ট্রানজিটসহ আরও নানা কাজে বাংলাদেশকে দরকার। আর কিছু না হোক, পরাশক্তি হতে আগ্রহী কোনো দেশই চাইবে না, তার প্রতিবেশী কোনো দেশে এসে অপর পরাশক্তির প্রভাব বাড়তে থাকুক। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পরে হলেও এমন বিভিন্ন পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ‘ট্রেড অফ’ করতে জানতে হবে।

তৃতীয়ত ও বিশেষত, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ, আমাদের তিস্তা ব্যারাজসহ অন্যান্য ব্যারাজের কারিগরি অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গঙ্গা ব্যারাজের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। পলিবহুল একটি নদীতে সমতলে নির্মিত ব্যারাজের পানি ও পলি ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্য সম্পদ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা কীভাবে সুচারু রাখা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে খানিকটা দেরি হোক, কিন্তু দারুণ কিছু হোক।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হতে পারে, যত সুচারুই হোক, ব্যারাজই যদি নির্মাণ করতে হবে, তাহলে বিতর্ক কী? পাল্টা প্রশ্ন হতে পারে, নিজেদের কোনো কারিগরি ব্যবস্থা ছাড়া কূটনৈতিক দরকষাকষি কীভাবে হতে পারে? উল্টোভাবে দেখা যাক; ভারতের যদি ফারাক্কা ব্যারাজ না থাকত; গঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে তারা এতটা বেকায়দায় ফেলতে পারত কি?

পানি কূটনীতির ক্ষেত্রে উজানের দেশের কষা প্রধান ‘প্যাঁচ’ হচ্ছে ভাটির দেশকে নির্ভরশীল করে রাখা। সে ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রধান প্যাঁচ অবধারিতভাবেই যতদূর সম্ভব সেই নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বনির্ভর হওয়া। কোনো ধরনের স্থাপনা না থাকা নদীর ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রশ্ন– যে নদীর উজানে ইতোমধ্যে ফারাক্কার মতো ব্যারাজ রয়েছে, সেখানে পাল্টা ও পরিবেশসম্মত কারিগরি ব্যবস্থা ছাড়া নির্ভরশীলতা দূরীকরণে আর কী করা যেতে পারে?

মনে রাখতে হবে, ড্যাম বা ব্যারাজের মতো স্থাপনা নিয়ে যে কোনো অববাহিকার উজানের দেশ ও ভাটির দেশের কারিগরি যুক্তিগুলো একই ধরনের হতে পারে না। পানির জন্য যাদের উজানের দেশের ওপর নির্ভর করতে হয় এবং পানির জন্য যাদের উজানের দেশের ওপর নির্ভর করতে হয় না, তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি কি কখনও সমান হতে পারে?

শেষ কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতি ও গঙ্গা-ফারাক্কা কারিগরি দিক বিবেচনায়, গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত ‘সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত’। গঙ্গার পানিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কূটনৈতিক নাজুকতা বিবেচনায় একটি কারিগরি ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’ জরুরি। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হতে হবে ভৌগোলিক ও প্রতিবেশগত নাজুকতার প্রশ্নটি মাথায় রেখে।

ঘ. অতীব গোপনীয়তার বিপদ
শেষ প্রশ্ন, গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ সংক্রান্ত নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না কেন? দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন নদী বিশেষজ্ঞ আমাকে বলেছেন, তিনিও গঙ্গা ব্যারাজের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বা বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনার নথি দেখেননি।

প্রশ্ন হচ্ছে, গঙ্গা ব্যারাজ সংক্রান্ত নথিপত্র যেভাবে ‘অতীব গোপনীয়’ করে রাখা হয়েছে, তাতে কার লাভ হচ্ছে? এ ধরনের নথি দেশের ভেতরে ও বাইরে যাদের লাভবান করতে পারে, তাদের না পাওয়ার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে? আন্তঃসীমান্ত নদী বিষয়ক নথিপত্রের ক্ষেত্রে অতীতে একাধিকবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব নথি অহেতুক ‘ক্লাসিফায়েড’ করে রেখেছে, সেগুলো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে।

গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নথিগুলো বরং দেশীয় বিশেষজ্ঞ বা বুদ্ধিজীবী, এমনকি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে খোলামেলা আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি ও প্রয়োজন স্পষ্ট হতো। বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিস্তীর্ণ ঝুঁকির এই প্রকল্প নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাও সহজ হতো। নথিপত্র আর যে কোনো বিষয়ে বুদ্ধি যে কেবল বুদ্ধিজীবীদের মাথা থেকেই আসতে পারে– শাস্ত্রে কোথাও এমন কথা বলা নেই।

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×