ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধ

চুকনগর জেনোসাইডের সাক্ষী ভদ্রা নদী

চুকনগর জেনোসাইডের সাক্ষী ভদ্রা নদী
×

ভদ্রা নদী। ছবি: অনুপ্রিয় প্রাগৈতিহাসিক

হিলাল ফয়েজী

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ১৮:০৯ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ | ১৮:২৭

​গ্রিক শব্দ ‘জেনোস’, যার অর্থ জাতি বা উপজাতি। ল্যাটিন শব্দ ‘সাইড’, যার অর্থ হত্যা। এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে জেনোসাইড। ১৯৪৪ সালে পোল্যান্ডের আইনজীবী রাফায়েল ল্যামকিন সর্বপ্রথম পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। জেনোসাইড বিষয়টি হত্যাকাণ্ডকে ছাড়িয়ে যায়। এটি এমন একটি অপরাধ, যেখানে কোনো জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস বা মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়।

​১৯৭১ সাল জুড়ে বাংলাদেশ প্রান্তরে শত শত জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে। ‘৩০ লাখ নাকি তিন লাখ’– এমন অমানবিক বিতর্ক তুলে দেয় একাত্তরকে মহিমাচ্যুত করতে কোনো কোনো হীনচক্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃতদের পরিসংখ্যান ঠিক ঠিক হয়েছে কি? সম্ভব নয়। আনুমানিক হিসাবেই মানবজাতি চলে। কিন্তু বাংলাদেশে একাত্তরে সংঘটিত অসংখ্য জেনোসাইড নিয়ে তর্ক তোলার অবকাশ নেই। সেই জেনোসাইডের জন্য অপরাধীদের বিচার চান, নাকি তাদের চুম্বন করবেন– সেটা ভিন্ন কথা।

​আজ ২০ মে। ৫৫ বছর আগে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে যে জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল, সেটি যে জানামতে মানবেতিহাসে স্বল্পতম সময়ের বৃহত্তম জেনোসাইড, তা পৃথিবী ঠিকমতো জানে না। জাতিসংঘের অসাড় কর্ণ। কিন্তু আমরা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ-অনুকূল কজনই বা জানি। এই না জানাটিও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জাতিগত অজ্ঞতার দুঃখজনক পরিচয়। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যে বিশাল জেনোসাইড-গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তা স্বীকৃতি পায়নি আজও। এ জন্য আমরা হা-হুতাশে কাল কাটাব না। আমাদের কাজ চলছে, চলবে। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও একাত্তরের জেনোসাইডের স্বীকৃতি আদায়ের দৃঢ়পণ প্রচেষ্টা চলবেই। অপরাধীদের বিচার হতেই হবে।

​১৯৪৭ সালে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের তরবারিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম ভাগে মোট পাঁচটি বড় জাতিসত্তা বিরাজমান ছিল। পূর্বভাগে বাঙালি। পশ্চিমভাগে পাঞ্জাবি, পাঠান, সিন্ধি এবং বেলুচি। পাকিস্তানের শাসনভার কার্যত পাঞ্জাবি সেনা, আমলা ও বিত্তবানদের হাতে ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম ভাগের মধ্যে যে আঞ্চলিক বৈষম্য ছিল, তা অবর্ণনীয়। একালের বৈষম্যবিরোধী তরুণেরা তা অবহিত নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে আঞ্চলিক ​বৈষম্যবিরোধী এমন গণবিদ্রোহী সংগ্রামগাথা কোথাও রচিত হয়নি। ১৯৫২-তে আমরা বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সফল হয়েছি। ১৯৭১ সালে ভূমির অধিকার অর্জন করেছি। নদীমাতৃক বাংলাদেশ রক্তমাতৃক বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল ১৯৭১ সালে।

​ভদ্রা তেমনই একটি নদী। চুকনগর বাজারের পাশ দিয়ে সমুদ্রপানে চলে যাওয়া সেই নদীকে মানবেতিহাসের স্বল্পতম সময়ে সংঘটিত বৃহত্তম জেনোসাইডের রক্তপ্লাবনে প্রবাহিত করে দিয়েছিল পাকিস্তানের দখলদার নৃশংস সেনাদল। চুকনগর জেনোসাইড বস্তুত ছিল একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকায় শুরু হওয়া জেনোসাইড ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এবং ‘অপারেশন বিগবার্ড’-এর প্রলম্বিত অংশ। সত্তরের নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের আমলা-সামন্তগোষ্ঠী ও সেনানেতৃত্ব এই গণরায়কে না মেনে রক্তে ডুবিয়েছিল ২৫ মার্চ, ৭১-এ। সে রাতে ‘বিগ বার্ড’ বঙ্গবন্ধুকে ওরা গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেল। গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই কৌশলে স্বাধীনতা ঘোষণা করে গেলেন গণরায়ে বিজয়ী নেতা। সেই থেকে পৃথিবী পেল এক নব মানচিত্র। বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।

অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে নৃশংস অভিযান চলল দেশজুড়ে। বুলেট বেয়নেট আগুন ধর্ষণ। প্রান্তিক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাস বিশেষত দক্ষিণ বাংলার জনপদ জুড়েই। বৃহত্তর বরিশাল-খুলনা-যশোর-ফরিদপুর থেকে লাখ লাখ বিপন্ন জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে দেশান্তরের মরিয়া সিদ্ধান্ত নিল। সঙ্গে নিল যার যার শেষ সম্বল। হাজার হাজার নৌকা নিয়ে লাখ মানুষ উপনীত হলো ভদ্রা নদীতীরের চুকনগর বাজার প্রান্তরে। সুবিধামতো প্রতি সন্ধ্যায় সীমান্ত পাড়ি দিতে তারা চুকনগরে অপেক্ষমাণ থাকছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অনুচরেরা শরণার্থীদের খবর পৌঁছে দিলে যশোর সেনানিবাসে। সাতক্ষীরা ক‍্যাম্প থেকে ১৯৭১-এর ২০ মে বৃহস্পতিবার সকালে ঘাতক পাকিস্তানি সেনারা বিপুল অস্ত্র ও বুলেট নিয়ে হাজির হলো চুকনগর বাজারে। ওরা কেউ রান্না করছিল। মালপত্র গোছানোর কাজে ব‍্যস্ত ছিল। মাতৃদুগ্ধ পান করছিল শিশু। হঠাৎ নেমে এলো পার্থিব নরক। পাকিস্তানি হিংস্র সেনারা শুরু করল বেপরোয়া বুলেট বর্ষণ। অবিরাম তা চলল চার-পাঁচ ঘণ্টা। রক্তবন‍্যা। চিৎকার। আর্তনাদ। হাজার হাজার শবদেহ। সৎকার অসম্ভব। স্থানীয় উদ্যোগে ভদ্রা নদীতে সব লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার ব‍্যবস্থা হলো।

সেদিন ​কতজন মারা গিয়েছিল? সে সাক্ষ্য দিতে অপারগ ভদ্রা নদী। কেউ বলে ২০ হাজার, কেউ বলে ৩০ হাজার। গবেষকরা বলেন, কমপক্ষে ১০ হাজার। এবার মানবেতিহাস খোঁজ করে দেখুন চুকনগরের এই জেনোসাইড স্বল্পতম সময়ে বৃহত্তম গণহত্যা কিনা। জেনোসাইডের সংজ্ঞা বিচারে এমন নৃশংস-বিশাল হত্যাকাণ্ড আর কোথাও হয়েছিল কিনা।

​শবদেহ সৎকারের উপায় ছিল না। ভদ্রা নদীতে সেই লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জোয়ার-ভাটায় সে লাশ মাসখানেক ধরে এদিক-ওদিক ভাসছিল। সে লাশ বঙ্গোপসাগরেও পৌঁছেছিল।

​১৯৭১ বাংলাদেশ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিচার এখনও মেলেনি। স্বল্পতম সময়ে মানবেতিহাসের বৃহত্তম চুকনগর জেনোসাইডের ক্ষেত্রেও একই। জাতিসংঘের অসাড় কর্ণে সাড়া জাগাতে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। জেনোসাইড বাংলাদেশ, জেনোসাইড চুকনগর, সবকিছুর স্বীকৃতি আদায় ও বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ-বিবেক জেগে ওঠো, দাঁড়াও এবং এগিয়ে চলো প্রতিদিন।

​চুকনগরসহ একাত্তরের সকল শহীদ এবং জনযোদ্ধাদের অভিবাদন।

হিলাল ফয়েজী: প্রকৌশলী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×