প্রতিবেশী
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের এক বছরেও যে শিক্ষা হলো না
স্তুতি ভাটনগর
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতের এক বছর পূর্ণ হলো, যে পরিস্থিতি অল্প সময়ের জন্য হলেও দুই পরাশক্তিধর দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছিল। যদিও ৮০ বছর ধরে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সহিংস সংঘাত সাধারণ ঘটনা ছিল, কিন্তু সর্বশেষ লড়াই ছিল ভিন্ন ধরনের।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনসহ নতুন অস্ত্র ব্যবহার করেছে। অবিশ্বাস ও তীব্র বাক্যবিনিময়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা আঞ্চলিক অংশীদারিত্বকে গুরুতর পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এক বছর পরও উত্তেজনা চরমে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার একটি অন্তর্নিহিত ঝুঁকি বিদ্যমান।
এই সংঘাতের পর পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী পুনরায় রাজনৈতিক মূলধারায় ফিরে আসে। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক প্রতিক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার পর সেনাপ্রধান সৈয়দ অসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল এবং পরে দেশের প্রথম প্রতিরক্ষাপ্রধান পদে উন্নীত করা হয়।
এর পর থেকে মুনিরের প্রভাব বেড়েই চলেছে। তিনি ট্রাম্পের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।
ভারতে অপারেশন সিঁদুরকে মোদি সরকারের দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতির বিজয় হিসেবে দেখা হয়েছিল এবং এটি ছিল দেশটিতে এক বিরল রাজনৈতিক ঐকমত্যের মুহূর্ত। তবে কাশ্মীরের আলোচিত রাজ্যের মর্যাদা বাতিলের পর অঞ্চলটিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা যায়নি। ফলে সরকারি দাবি এবং পর্যটনকে প্রসারের প্রচেষ্টা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
হামলার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে কাশ্মীর উপত্যকায় নিরাপত্তা অভিযানের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে পর্যটকের সংখ্যা তীব্রভাবে হ্রাস পায় এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তা অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যা মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।
সম্ভবত এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার ভিন্নতা। এই যুদ্ধ চীন ও তুরস্ক উভয়ের সঙ্গেই পাকিস্তানের অভিযানে সহযোগিতাকে বিশেষভাবে সামনে এনেছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাদের হামলায় চীন নির্মিত যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি তুরস্ক নির্মিত ড্রোনও ব্যবহার করেছে। তাদের স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা কার্যক্রমও চীনের সহায়তায় পরিচালিত হয়েছিল।
যুদ্ধের পর পাকিস্তানও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের তেলভান্ডার উন্নয়নে একটি নতুন চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
ভারত এক দশক ধরে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্য উল্লেখযোগ্যভাবে অস্বস্তিকর করে তুলেছিল।
এদিকে মার্কিন শুল্ক এবং ভারতের রুশ তেল ক্রয়ের জেরে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একসময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। মোদির অসময়োচিত ইসরায়েল সফর এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে তার প্রভাবের দৃশ্যমান অভাবও আঞ্চলিক নেতা হিসেবে ভারতের ঘোষিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এটি ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশলের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে, বিশেষ করে সংঘাতকালে।
ভারত সক্রিয় কূটনীতিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং গত এক বছরে ৩০টিরও বেশি দেশে সংসদ সদস্য ও সাবেক কূটনীতিকদের নিয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। যদিও ভারত এই সফরগুলো সফল বলে দাবি করে, কিন্তু তাদের মধ্যকার সংঘাতে পাকিস্তানই যে আগ্রাসী ছিল– তা বিশ্বকে বোঝাতে এসব সফর তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি।
এক বছর পরও উভয় পক্ষের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর আগের মতোই উত্তপ্ত। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই ভবিষ্যৎ সংঘাত আরও বাড়ানোর দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করেছে। পর্দার আড়ালে আলোচনার ক্ষীণ আশা থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে কথিত সমর্থনের জন্য ভারত পাকিস্তানকে কঠোরভাবে সতর্ক করে চলেছে।
ভারত এটিও পুনর্ব্যক্ত করেছে– পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ করার পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত থাকবে। এ কারণে পানি নিরাপত্তা নিয়ে একটি বড় উদ্বেগ অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এর জবাবে পাকিস্তান স্পষ্ট করে বলেছে– পাকিস্তানকে পুনরায় লক্ষ্যবস্তু করার যে কোনো চেষ্টা এমন পরিণতি ডেকে আনবে, যা ভারতের জন্য ‘ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ বা কৌশলগত বা রাজনৈতিকভাবে সুখকর’ হবে না।
পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এবং তীব্র বাগাড়ম্বর উভয়ের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপের সম্ভাবনা সংকুচিত করেছে। ফলে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, কেবল আস্থার নিম্ন স্তরটি বজায় থাকবে। যুদ্ধবিরতি আপাতত বহাল থাকলেও সংঘাতের পরিবেশ অব্যাহত।
স্তুতি ভাটনগর: ইউএনএসডব্লিউ সিডনির ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাডিজের প্রভাষক; দ্য কনভারসেশন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- প্রতিবেশী
