ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বিচারহীনতা কেবল ধর্ষকের আয়ু বাড়ায়

বিচারহীনতা কেবল ধর্ষকের আয়ু বাড়ায়
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ১১:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নৃশংসভাবে সন্তানের মৃত্যুর পরও পিতা বলতে পারেন– ‘বিচার চাই না। আমার মেয়েও আর ফিরবে না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।’ এই আক্ষেপের দায় কি রাষ্ট্রের? যদি থাকত তবে কি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল থেকে ধর্ষণের পর শ্বাসনালি কেটে ফেলা ৭ বছরের শিশু বেরিয়ে সাহায্য খোঁজে? নরসিংদীতে বাবার কাছ থেকে অপহৃত কন্যার মরদেহ পাওয়া যায় পরদিন সরিষা ক্ষেতে? এর প্রতিটি ঘটনার জন্য সবচেয়ে বড় দায় বিচারহীনতার। 

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ৭ বছর বয়সী শিশু নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ধড়হীন শরীর ছিল প্রতিবেশীর ঘরে খাটের তলায়; মাথাটা ছিল বাথরুমে। বিকৃত যৌনাচারে আসক্ত স্বামীকে বাঁচাতে চেয়েছিল তার স্ত্রী। এই নারকীয়তার বর্ণনা হয় না। কিন্তু বাস্তবতা এমনই। তবুও সেই শিশুর সবচেয়ে আপনজনকে তখন সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে হয়। নিহত শিশুর বিপন্ন বাবা বলেন, ‘বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার বড় কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর ধামাচাপা পড়ে যাবে।’ 

বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারণা পাওয়া যাবে চাঞ্চল্যকর কয়েকটি মামলার পরিণতি থেকে। মাগুরায় চাঞ্চল্যকর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত রায় বিচার বিভাগের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চের সে নৃশংস ঘটনা সারাদেশে তোলপাড় করেছে। আশ্চর্য ব্যাপার, সে বছর ১৭ মে রায়ে খালাস পেয়েছিল তিনজন। একজনের ফাঁসির দণ্ডাদেশ হয়েছিল। ইতোমধ্যে আরও এক বছর আয়ু অতিক্রম করেছে সেই ফাঁসির আসামি। রায় এখনও কার্যকর হয়নি। অথচ ধর্ষণের পর বেঁচে থাকা কয়েকটা দিন ওইটুকু শিশু যেন পৃথিবীতে দোজখ দেখে বিদায় নিয়েছে। 

কুমিল্লার তনু হত্যাকাণ্ড মামলায় সামান্য অগ্রগতিতেই লেগেছে ১০ বছর। এক দশক পর জানা গেল, তিনজন নয়; সম্ভবত চারজন জড়িত ছিল ঘটনায়। এর মধ্যে আবার সন্দেহভাজন একজন কুয়েতে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধর্ষণের পর কতক্ষণ তনু বেঁচে ছিলেন– কোনোদিন জানা যাবে না। কিন্তু তাদের ধর্ষক, হত্যাকারীদের আয়ু এক দশকের বেশি হয়েছে। ধর্ষণের শিকার মানুষকে দ্রুত হত্যা করা হয়; বেঁচে থাকে ধর্ষক– এটাই ট্র্যাজেডি। ধর্ষকদের বাঁচিয়ে রাখা হয়। যেমন ধরুন বহুল আলোচিত রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার রায়ে পাঁচ আসামিকেই খালাস দিয়ে বিচারক বলেছিলেন, ‘৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় না। পুলিশ যেন ৭২ ঘণ্টা পর কোনো ধর্ষণের মামলা না নেয়।’ 

এমনিতেই নানা প্রেক্ষাপটে দেশে ধর্ষণের তুলনায় মামলার সংখ্যা অনেক কম। ভুক্তভোগীর পরিবার নানা রকম চাপ, অসচ্ছলতা বা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে মামলা পর্যন্ত যায় না। অনেক ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায় গ্রাম্য সালিশে। এর মধ্যেও গত বছর দেশে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে এর আগের বছরের তুলনায় দেড় হাজারটি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যাচ্ছে, পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুসারে ২০২৪ সালে ধর্ষণের মামলা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৫৬৬টি। ২০২৫ সালে সংখ্যা দাঁড়ায় সাত হাজার ৬৮টিতে। বিচারহীনতার একটি উদাহরণ পাওয়া যাবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা থেকে। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৩৫ হাজারেরও বেশি ধর্ষণের মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। সারাদেশে বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। এর মধ্যে কত বাদী যে মারা গেছেন!  

ধর্ষণের পর আমাদের শিশুদের লাশ পড়ে থাকে ফ্ল্যাটে। প্রজাপতি নকশা করা ক্লিপ দেওয়া চুলসমেত মাথাটা থাকে বাথরুমের বালতিতে। আমাদের মেয়েদের মরদেহ খুবলে খায় ধানক্ষেতের ধূর্ত শিয়াল। ধর্ষিত নারীকে ছুড়ে দেওয়া হয় চলন্ত বাস থেকে। ডোবা, জলায় ফুলে ভেসে ওঠে আদরের কন্যার কোমল শরীর। তখনও ওর মুখে মেখে থাকে জীবনের সকল মায়া। প্রতিবারই আওয়াজ ওঠে দ্রুত বিচারের। তারপর বিচারহীনতাই ধর্ষকদের আয়ু বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশে। 

নৃশংস হত্যার শিকার পল্লবীর ছোট্ট শিশুটির বাবার এই সত্য ভাষণের প্রেক্ষিতে আমাদেরও ক্ষোভে বলতে ইচ্ছে করে– এমন এক রায় হোক, যাতে পিলে চমকে যায়; যেন বুক কেঁপে ওঠে। এমন এক রায় দিয়েছিলেন ২০০০ সালে পাকিস্তানের আদালত। সিরিয়াল কিলার ও শিশুদের যৌন নির্যাতনকারী জাভেদ ইকবাল মুঘলকে তার নিজের ব্যবহার করা লোহার শিকলে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর ১০০ টুকরো করে এসিডে গলিয়ে দেওয়ার রায় হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন ক্ষুব্ধ হয়েছিল। এমন প্রতিশোধমূলক রায়ে আমরাও বিস্মিত হয়েছি। কিন্তু জাভেদ ইকবাল মুঘল যে ১০০ শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন করে তাদের এসিডে গলিয়ে নদীতে মিশিয়ে দিয়েছিল– সেই নির্মমতার ঘটনা কি কোনো শাস্তি দিয়েই নেওয়া যায়? তাই রায়টি ছিল এক রকম প্রতীকী। 

হত্যার বদলে হত্যাকে সমর্থনের সুযোগ কারও থাকতে পারে না। কিন্তু যে মা সন্তানের ধড়বিহীন মরদেহ খাটের তলা থেকে টেনে বের করেন, আর বাথরুমের বালতির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় মাথা, সেই মায়ের যন্ত্রণাকে সামান্য নিরাময়ের এতটুকু সুযোগ কি আছে রাষ্ট্রের? কেমন অনুভব হয় সেই মায়ের যখন তারা দেখবেন, তাদের সন্তানের হত্যাকারী উন্মুক্ত আকাশের নিচে উপভোগ করছে জীবন অথবা প্রস্তুতি নিচ্ছে আবারও কোনো রামিসাকে লক্ষ্যভেদের? বিচারহীনতা ধর্ষকের আয়ু বাড়িয়ে দেয়। সেই ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখালেন পল্লবীর নিহত শিশুটির বাবা।    

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×