সাদা কালো
নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী কেন?
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ১১:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঢাক ইতোমধ্যে বাজতে শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মঙ্গলবার বলেছেন, চলতি বছর বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। তিনি এও বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সব ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে যা শুরু হতে পারে (ডেইলি স্টার, ১৯ মে ২০২৬)।
অবশ্য এর আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ক্ষমতাসীন বিএনপি এখনও তৎপর না হলেও দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বসে নেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন– সর্বত্র দলীয় সমর্থনপ্রত্যাশীরা বেশ সক্রিয়। পোস্টার, ব্যানার ও সামাজিক মাধ্যমে তারা ভোটারদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। সঙ্গে দলের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে এ বাণীও প্রচার করছেন– এলাকাবাসী তাঁকেই মেয়র, চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর পদে দেখতে চায়। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি আরও একধাপ এগিয়ে। ঢাকার দুটিসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে তারা।
সরকার যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে এ নির্বাচনী কাফেলা শুরু করার কথা ভাবছে, সেখানে বিশেষত জামায়াত-এনসিপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি আগেই শুরু করেছে কেন? কোনো কোনো পৌরসভায় তারা মেয়র প্রার্থী ঠিক করলেও প্রচার দেখে বলা যায়, সিটি করপোরেশনের দিকেই বেশি নজর তাদের।
এটা ঠিক; ক্ষমতা, অর্থবিত্ত, সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঢাকাসহ সিটি করপোরেশনগুলোতে বাস করে। তাই সাধারণের কাছে এগুলোর আকর্ষণ যেমন, তেমনি মিডিয়া ফোকাসও বেশি। সম্ভবত এ কারণেই দল দুটো সিটি করপোরেশন নিয়ে বেশি মনোযোগী। এটিও সত্য; গ্রাম তো বটেই, বহু পৌর এলাকায়ও এনসিপির জনভিত্তি কম। জামায়াতেরও ভিত্তি তেমন মজবুত নয়। নগরগুলোর ব্যাপারে তাদের অতি আগ্রহের পেছনে এ সত্যেরও ভূমিকা থাকতে পারে।
কেউ কেউ বলছেন, বিগত সংসদ নির্বাচনে তো মফস্বলের অনেক আসনেই জামায়াত রীতিমতো বাজিমাত করেছে; বিভিন্ন আশ্বাসের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট নিয়ে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ কৌশল কাজ করবে না কেন? এ প্রশ্নের জবাবে আরেকটি প্রশ্ন করা যায়, ন্যাড়া কি বারবার বেলতলা যায়? গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তো বটেই, জামায়াতকে ভোট দেওয়ার ফল আওয়ামী সমর্থকদের জন্য ভালো হয়নি। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ এলাকায়ই নির্বাচনের আগে দেওয়া আশ্বাস ভুলে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই নৌকার সমর্থকদের বিরুদ্ধে আবারও খড়্গহস্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে মব সহিংসতা সাধারণ মানুষদের আতঙ্কিত করেছে, তা এখনও বন্ধ হয়নি। এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রধান শিকার তখনও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীরা; এখনও তারাই আছেন। স্রেফ জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ার কারণে গত ১৪ মে নওগাঁর নিয়ামতপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে (ইত্তেফাক, ১৫ মে, ২০২৬)।
সরকারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বিরোধী দল এখনও এই বুলি আওড়ায়– বিচার শেষ হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠবে না। বিগত বহু দশক পরস্পর হাত ধরে চলা বিএনপি-জামায়াতের এমন ঘোষণার উদ্দেশ্য সম্ভবত সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেওয়া। সংসদে গণভোট বা জুলাই সনদ নিয়ে যতই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হোক, নিজেদের অভিন্ন প্রতিপক্ষকে রাজনীতির বাইরে রাখার ব্যাপারে দুদলের ঐকমত্য স্পষ্ট; যদিও বহুল কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এ কারণে অধরাই থেকে যেতে পারে।
এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রথমে কোন পর্যায়ে হবে, আর জামায়াত-এনসিপি কোনটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, এগুলোর চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, নির্দলীয় আয়োজনে দলগুলো প্রার্থী ঠিক করে দিচ্ছে কেন?

প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে সব পর্যায়ের স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ার পথ পরিষ্কার করা হয়েছিল রীতিমতো আইন সংশোধন করে। তখন বিএনপি-জামায়াতসহ প্রায় সব বিরোধী দল এর বিরুদ্ধে ব্যাপক সোচ্চার ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে যেসব অধ্যাদেশ জারি করে, সেগুলো বিএনপিও হুবহু সংসদে পাস করেছে। ফলে আইনত বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা ঘোষণার সুযোগ নেই।
এ প্রেক্ষাপটেই রাজনৈতিক দলের প্রার্থিতা ঘোষণায় এমনকি সিইসি উদ্বিগ্ন। রোববার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রকৃতি নিয়ে আলাপকালে বলেছেন, ‘এটা আমার জন্য চিন্তার। আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে’ (সমকাল, ২০ মে ২০২৬)। শুধু সিইসি কেন; নাগরিক সমাজেও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো এভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় চরিত্র ফিরে পাবে না। দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থী মনোনয়নে দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাই এতে প্রাধান্য পাবে। আর তাঁকে পাস করাতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন দলের নেতাকর্মীরা। আবার যারা দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে চাইবেন না, তাদের ওপর বহিষ্কারের খড়্গ নেমে আসবে। অর্থাৎ আবার একই দলের স্থানীয় পর্যায়ে বিভাজন, মারমারি, শত্রুতা। নির্বাচনী পরিবেশও কলুষিত হয় এতে। মোদ্দা কথা, এক সময়কার উৎসবমুখর স্থানীয় সরকার নির্বাচন ফিরিয়ে আনার যে আকাঙ্ক্ষা থেকে নির্বাচনকে নির্দলীয় করার চেষ্টা হলো, তা পুরো মার খাবে।
আরেকটা বিষয়, অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর চরিত্র ছিল প্রধানত শিক্ষক, খুদে ব্যবসায়ী, এমনকি কৃষকের মতো বহু সামাজিক ব্যক্তিত্ব এসব নির্বাচনে নেতৃত্বে উঠে আসতেন, সমাজের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। ফলে শুধু বিভিন্ন পলিসি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমাজের প্রয়োজনটাই প্রাধান্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো না; বিকল্প নেতৃত্বও তৈরি হতো। এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে জনপ্রিয় ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা চেয়ারম্যান এক সময়ে সংসদ সদস্য, এমনকি মন্ত্রীও হয়েছেন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্দলীয় চরিত্র ক্ষুণ্ন হলে সেই সম্ভাবনা তিরোহিত হবে।
শুধু তাই নয়। নির্দলীয় প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে দলীয় হস্তক্ষেপ যে কোনো নাগরিকের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকারও খর্ব করে। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের দিকে তাকানো যেতে পারে। সদ্য সমাপ্ত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ বহু সংখ্যক বার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে জনপ্রিয় অনেক আইনজীবীকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এতে শুধু ওই আইনজীবীদের অধিকারই খর্ব হয়নি; নজিরবিহীনভাবে অত্যন্ত কম ভোট পড়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো এসব ঝুট-ঝামেলা এড়িয়ে প্রকৃত অর্থেই সর্বজনীন বা সর্বজনস্বীকৃত হোক– এ কামনা গণতন্ত্রমনা সব মানুষের মতো আমারও।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
