ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

নির্বাচিত শোকের রাজনীতি

নির্বাচিত শোকের রাজনীতি
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১১:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

হামে আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা বাবা-মায়ের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটির দৃশ্য বা ছবি সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন বা মুহূর্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদরের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য ছুটছেন তারা; চিকিৎসকদের কাছে হৃদয় নিংড়ানো আবেদন জানাচ্ছেন। তাদের কারও সন্তান বেঁচে গেছে, কারও সন্তান আর এই জগতে নেই। সরকারি সূত্র বলছে, দেশে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৪৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং ৩৮৯টি মৃত্যু হাম সন্দেহে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (বাংলা ট্রিবিউন ১৮ মে, ২০২৬)। প্রতিদিনই হামে আক্রান্তের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুসংখ্যা। সরকারি পরিসংখ্যান আরও বলছে, এ পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৭৬৭ (দৈনিক সংবাদ, ১৮ মে, ২০২৬)। যার চিকিৎসা হতে পারত জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে, তাকে আনতে হচ্ছে ঢাকায়। কিন্তু এখানে জায়গা নেই হাসপাতালে। বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন বাবা-মা-স্বজনেরা। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়, জনপরিসরে এটি নিয়ে আলোচনা-আতঙ্ক এবং হাহাকার উঠলেও সরকার বা বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে খুব একটা হেলদোল নেই। সরকার চলছে গতানুগতিক ধারায়, আর বিরোধীরা ব্যস্ত জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে হামের আক্রমণ মহামারির রূপ নিলেও তার আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি জায়গা পায়নি। এই মৃত্যুগুলো আমাদের নীতিনির্ধারকদের নাড়া দিচ্ছে না কেন? সেই শিশুরা উচ্চবিত্ত পরিবারের নয় বলে?

আসলে দলতন্ত্র আমাদের এতটাই গ্রাস করেছে; কোন মৃত্যু আমাদের নাড়া দেবে বা দেবে না, অনেকাংশেই তা এখন হয়ে গেছে সিলেকটিভ বা নির্বাচিত। যিনি বা যারা মারা গেলেন, তারা কোন রাজনীতির অনুসারী ছিলেন প্রথমে তা খোঁজা হয় কিংবা ওই মৃত্যুতে কে বা কারা বেশি শোক বা ক্ষোভ জানাচ্ছেন, তাদের রাজনৈতিক রং দেখা হয়। আমি যখন দেখছি, একজনের মৃত্যুতে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বেশি শোক দেখাচ্ছে, তাহলে ওই মৃত্যু আমাকে স্পর্শ করলেও তা প্রকাশ করা যাবে না। এমনকি যারা শোক জানাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। যেমন এখন হাম নিয়ে যারা বেশি কথা বলছেন, তাদেরকে কেউ কেউ ‘হাম লীগ’ বলে সামাজিক মাধ্যমে চিহ্নিত করছেন। কেউ কেউ এমনও বলছেন, এই হাম সংক্রান্ত আলোচনা নাকি আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টা। লক্ষণীয়, তাদের কেউই আকস্মিক এ দুর্যোগের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা বা তা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলছেন না।

এই হাম নিয়ে হচ্ছে আরও কিছু রাজনৈতিক কাজকারবার। যেমন সরকার বলছে, ২০২০-এর পর হামের টিকা দেওয়া হয়নি। স্পষ্টত, অন্তর্বর্তী সরকারকে বাঁচিয়ে দোষ এর আগের আওয়ামী সরকারের ঘাড়ে দেওয়ার চেষ্টা। টিকার ঠিকাদার ছিল ইউনিসেফ। তাদের সঙ্গে প্রায় জনস্বাস্থ্যবিদই অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনার প্রক্রিয়া বদলানোর ভুল সিদ্ধান্তকে চলমান হাম সংকটের জন্য দায়ী করলেও সরকার ব্যস্ত তার চিরাচরিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে। হামে মৃত্যুবরণকারী শিশুদের প্রায় সবার জন্ম ২০২৪ সালে। হামের টিকা গ্রহণের জন্য তাদের ৯ মাস বয়স হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ সরকার গণঅভ্যুত্থানে বিদায় নেয়। কেন টিকা দেওয়ার বয়সের আগেই শিশুদের হাম হচ্ছে– সেই বিষয়ও তলিয়ে দেখা হচ্ছে না। 

সাম্প্রতিক সময়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে বিশেষত কারিনার স্বজনদের জন্য যে বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে, সেটির মূলেও রয়েছে ওই সিলেকটিভ শোক প্রকাশের রাজনীতি। তাকে ঘৃণার রাজনীতি বললেও ভুল হয় না। এ ধরনের অপচর্চা এক যুগ ধরেই হচ্ছে। তাদের বিরোধী পক্ষের কেউ মারা গেলে তখন সামাজিক মাধ্যমে এক দল লোকের মধ্যে ‘আলহামদুল্লিল্লাহ’ লেখার ঝোঁক দেখা যায়। আবার তারা যখন কারিনার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত তখন অন্য পক্ষে সৃষ্টি হয়েছে উল্লাস। কোনো মৃত্যুই উদযাপনের নয়– এ সর্বজনীন মূল্যবোধ চাপা দিয়ে এখন কারও মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা-না করার মানদণ্ড হয়ে পড়েছে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। আগে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিভিন্ন ফোরাম থেকে ‘নাস্তিক’ ট্যাগ দিয়ে কারও মৃত্যুকে অশ্লীলভাবে উদযাপন করা হতো। এখন মার্কার হলো ‘ফ্যাসিস্ট’-‘লালবদর’। গণঅভ্যুত্থানে সমর্থন দেয়নি, এমন লোককে বলা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিস্টের দোসর। আর গণঅভ্যুত্থানের সমর্থকদের বলা হচ্ছে লালবদর। এক সময়ের আওয়ামী সমর্থক এবং পরে গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় কর্মী কারিনাও এ বিভাজনের শিকার। তাই কারিনার মা যতই বলুন– ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা নই’; শহীদ মিনারে কারিনার জানাজা শেষে তাঁর নামে স্লোগান দিয়ে মিছিল করেছে এনসিপি। 

সন্তান হারানোর বেদনা সকলেরই সমান। কথায় বলে, যার যায়, সে-ই বোঝে। হামে মৃত্যুবরণকারী শিশুর বাবা-মায়ের যন্ত্রণা থেকে সন্তানহারা কারিনার বাবা-মায়ের কষ্ট-বেদনাকে আলাদা করা যায় না। কিন্তু তৃতীয় পক্ষ আমরা ঠিক করে রেখেছি কার জন্য কাঁদব, কার জন্য কাঁদব না। বহু আগেই আমাদের প্রতিবাদগুলো যেমন সিলেকটিভ হয়ে গেছে, তেমনি হয়ে গেছে শোক প্রকাশও। তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সবচেয়ে বেশি হয়েছে ‘নির্বাচিত শোক’। নিজেদের বলয়ের বা পছন্দের লোকের বাইরে কারও মৃত্যুতে সরকার থেকে কোনো শোক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। এমনকি দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা, তাদেরও অনেকে তখন মৃত্যুর পর পাননি রাষ্ট্রীয় শোক বা সম্মান। 

কী এক ভয়ংকর প্রতিশোধের নেশায় বুঁদ হয়ে আছি আমরা! আমরা শিখে গিয়েছি– সামষ্টিক বা সামগ্রিক শোক বলে কিছু নেই। শোক শ্রেণিগত তো বটেই, দলগতও। কান্নার কোনো রং নেই বলা হলেও আমরা তাতে রাজনৈতিক রং আরোপ করছি। এই ভয়ংকর প্রবণতার পরিণাম কী, তা কি আমরা বুঝতে পারছি? সব জীবনই মূল্যবান; কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু কাম্য নয়– এ বোধ ফিরে না এলে যে গর্তে আমরা পড়েছি, সে গর্তেই থেকে যাব। 

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

আরও পড়ুন

×