ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংসের ইন্ধন দিয়েছিল কারা?

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংসের ইন্ধন দিয়েছিল কারা?
×

কাওসার চৌধুরী

কাওসার চৌধুরী

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১১:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি বিশেষ দিবসে সেই বিষয়ের ব্যর্থতার সংবাদই শিরোনাম হলে সে প্রসঙ্গ বারবার আলোচনার দাবি রাখে। গত ১৮ মে ছিল আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। এই দিবসে বাংলাদেশের কয়েকটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল কমবেশি এমন– মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জাদুঘর থেকে অপসারিত। এর মধ্যে ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকার প্রতিবেদন ধরে এগিয়ে গেলে দেখি, এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর হলেও সেই জাদুঘর ঘিরেই উঠেছে ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলার অভিযোগ।

বলতে দ্বিধা নেই, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিই কমানো হয়েছে দৃশ্যমানভাবে। এই পরিবর্তন নজরে পড়েছে সাধারণ দর্শনার্থীদের। তারা জানিয়েছেন, স্বাধীনতার ইতিহাসের এত বড় একজন মহানায়ক (বঙ্গবন্ধু) গুরুত্ব পাননি গ্যালারির বিন্যাসে। ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৬৬ বা ১৯৬৯-এর আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের কোনো ছবি দর্শক দেখতে পাননি বলে জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমে।

জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান বলেছেন, গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় হামলা বা ভাঙচুরের আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়ায় কিছু প্রতিকৃতি ও নিদর্শন সাময়িকভাবে সরিয়ে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তথাকথিত এই ‘নিরাপদে সংরক্ষণ’-এর বিষয়টি ছিল আসলে মেটিকুলাস পরিকল্পনার অংশ। 

কোনো দলের প্রতি কারও প্রতিহিংসা থাকলে সেটা জাতির পিতার ভাস্কর্যে চরিতার্থ করতে হবে কেন? ১৯৪৮ থেকে বাঙালির ভাষার লড়াই, আমাদের আত্মমর্যাদা আর জাতিসত্তার উন্মেষের সেই ঊষালগ্ন থেকে কোন আন্দোলনটির কথা বলা যায় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে সরিয়ে রেখে? বাঙালির মুক্তি আর স্বাধিকার আদায়ের জন্য এই মানুষটি নিজের জীবনের সোনালি সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে যতদিন পাকিস্তান সরকারের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ছিলেন, সেই সময় যোগ করলে এক যুগের বেশি হয়। ৭০-এর নির্বাচনে তাঁর দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও যখন পাকিস্তানিরা যথাযথভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র করছিল; তখন একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর একটি অঙ্গুলির নির্দেশেই তো বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়।

অথচ ভাবতে বিস্ময় লাগে, শালপ্রাংশু সেই মানুষটির ভাস্কর্য যারা ভাঙচুর করছিল সেদিন, তাদের পিতামাতা কি আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাদের ওই সন্তানদের বলেননি কোনোদিন! 

শুধু ঢাকার বিজয় সরণিতে নয়; সারাদেশেই ভাঙচুর হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, ভাস্কর্য ও ম্যুরাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশীর মোড়ে অবস্থিত ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন হলের ভেতর থাকা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের ম্যুরাল উপড়ে ফেলা হয় প্রথমেই। সুপ্রিম কোর্টের থেমিস, শিশু একাডেমির ‘দুরন্ত’, সাভারের হেমায়েতপুর বাজারের কাছে ‘বিজয় যাত্রা’র মতো অনেক ভাস্কর্যই রক্ষা পায়নি রোষ থেকে। রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি স্থাপনাতেও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।

মেহেরপুরে ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স’-এ ভাঙচুরের সময় প্রথমে আঘাত করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে। একে একে ভাঙা হয় এখানকার ‘গার্ড অব অনার’, পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ, দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের বর্ণনা-সংবলিত ছোট ভাস্কর্যসহ অনেক কিছুই।

ময়মনসিংহের শশী লজে ঐতিহ্যবাহী ভেনাসের ভাস্কর্যটির মূল্য কখনও অর্থ দিয়ে নিরূপণ করা যাবে না। মাদারীপুরের ‘প্রবহমান ৭১’, ‘মুক্তবাংলা’ অথবা খুলনা বেতার কেন্দ্রে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য উপড়ে ফেলার ঘটনা কী বার্তা দেয় আমাদের?

দেশের প্রায় সব জেলায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত অসংখ্য টেরাকোটা ও ম্যুরাল ধ্বংস করা হয়েছে অবলীলায়। অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখেছি চট্টগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মইনউদ্দীন খান বাদলের কবর পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন কাণ্ড! 

অভিযোগ আছে, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য এবং ম্যুরালগুলো ধ্বংসের পেছনে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলের ভূমিকাই ছিল প্রধান। কিন্তু বিজ্ঞজনদের জিজ্ঞাসা, শুধু স্বাধীনতাবিরোধীরাই কি এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, নাকি দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীও ছিল এই যজ্ঞে? সুযোগ বুঝে তারাও ছুরি বসিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুকে!

কথায় বলে– ‘সময় সকল সত্য উদ্ঘাটন করে’। জাতি সেই সময়ের অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে। রাজনীতির এই ‘খেলা’টা কি শুধু স্বাধীনতাবিরোধীরাই খেলল; নাকি দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়রা ফাঁকতালে তাদের স্বার্থও হাসিল করে নিল! নাকি পুরো বিষয়টাই আসলে একটি যৌথ ‘মেটিকুলাস প্রজেক্ট’-এর ফসল! সেটা উদ্ঘাটনে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না বোধ করি! সময় খুব সমাগত!

কাওসার চৌধুরী
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা

আরও পড়ুন

×