আন্তর্জাতিক
পুতিন ও ট্রাম্পের প্রতি শির আতিথেয়তার বার্তা কী
ছবি: দ্য কনভারসেশন
আলেকজান্ডার করোলেভ
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ১৫:০৮ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১৬:১৫
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতাদের পরপর সফরের কারণে বেইজিংয়ের জন্য সপ্তাহটি বেশ ঘটনাবহুল ছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আতিথেয়তা, তোপধ্বনি, ছবি তোলার সুযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। প্রতিটি সফরই নিজ নিজ দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছিলেন ২০১৭ সালে। সুতরাং ২০১৭ সালের পর এটিই তার প্রথম সফর। এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হল, যখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বেশ টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে লিপ্ত এবং ট্রাম্পের অধীনে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে।
অন্যদিকে, পুতিনের জন্য এটি ছিল চীনে তাঁর ২৫তম সরকারি সফর। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝে চীন-রাশিয়া কৌশলগত জোটকে আরও সুসংহত করাই ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য। ইউক্রেনের সঙ্গে চীনের যুদ্ধ চলতে থাকায় পুতিন দেশটির অব্যাহত অর্থনৈতিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও আগ্রহী ছিলেন।
যদিও পরপর সংঘটিত এই সফরগুলোর সময়কাল নিয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করা উচিত নয়, মস্কো বলছে দুটির মধ্যে ‘কোনো যোগসূত্র ছিল না’, তবুও এগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গভীরতর কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ।
প্রথমত, চীনের কৌশলগত বিশ্বদৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ নয়, তা স্পষ্ট; তাছাড়া বেইজিং তা দেখাতে ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের ভাবভঙ্গি এবং আলোচনার ধরনে এটি দৃশ্যমান ছিল। বৈঠকের পুরোটা সময় জুড়ে তাঁর কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে করমর্দন থেকে শুরু করে কর্তৃত্বপূর্ণ শারীরিক ভঙ্গি পর্যন্ত শি একটি বার্তা দিয়েছেন– বেইজিংকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের সীমিত হয়ে এসেছে।
তাদের শীর্ষ সম্মেলনের সীমিত ফলাফল এই ধারা আরও শক্তিশালী করেছে। ট্রাম্প কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি, সংবাদ সম্মেলন বা যৌথ বিবৃতি ছাড়াই চীন ত্যাগ করেন। ইরান বা তাইওয়ান কোনোটির ক্ষেত্রেই কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে পুতিন তার ‘ভালো ও পুরোনো বন্ধু’ শি-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রায় ২০টি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ হল ট্রাম্পের সঙ্গে শির অস্বস্তিকর মুহূর্তটি ‘থুকিডাইডিসের ফাঁদ’-এর কথাই ইঙ্গিত করে। এই ধারণার মানে হল একটি উদীয়মান শক্তি অনিবার্যভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, যা যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে।
শি একটি শানিত প্রশ্ন উত্থাপন করলেন– চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত ‘থুকিডাইডিসের ফাঁদ’ অতিক্রম করে পরাশক্তিগুলোর সম্পর্কের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে?
শি আগেও এই ধারণাটি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এবার তাঁর স্পষ্টবাদিতা একটি সতর্কবার্তা দিয়েছে। আর সেটি হল চীনের উত্থানকে প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র যদি কেবল প্রতিরোধ কৌশলের ওপর নির্ভর করে চলে, তবে তারা একটি বড় সংকট তৈরির ঝুঁকি নিচ্ছে। সংক্ষেপে, বেইজিং ট্রাম্পের সফরকে ব্যবহার করেছে আস্থা, স্বায়ত্তশাসন এবং এই সত্যটি তুলে ধরতে যে, চীনের কাছে ওয়াশিংটনই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী নয়।
দ্বিতীয়ত, চীন-রাশিয়া জোট আগের মতো সমানে সমান না থাকলেও এর কৌশলগত গভীরতা বেড়েছে। আর বেইজিং এখন মার্কিন নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এ জোট ব্যবহার করছে।
গত সপ্তাহে ঝংনানহাইতে একান্ত্ই নেতাদের জন্য সংরক্সিত এক কম্পাউন্ডের বাগানে ব্যক্তিগত পদচারণাকালে ট্রাম্প জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, শি প্রায়শই সেখানে অন্যান্য বিশ্ব নেতাদের নিয়ে আসেন কিনা। শি উত্তরে বলেন, এই ধরনের সফর ‘অত্যন্ত বিরল’, তবে ‘পুতিন এখানে এসেছেন–সেটাও তিনি বলেন’।
এই কথোপকথনের সরল ব্যাখ্যা হল শি কেবল পুতিনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের গভীরতার কথাই উল্লেখ করছিলেন। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর মাধ্যমে ট্রাম্পকে সূক্ষ্মভাবে এটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ‘সীমাহীন’ অংশীদারিত্ব কেবল কথার কথা নয়। বেইজিং ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, মস্কো একটি বিশেষ কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই রয়েছে;অর্থাৎ চীনের হাতে বিকল্প রয়েছে। এর অন্তর্নিহিত বার্তা হল ওয়াশিংটন যদি চীনকে একঘরে করতে চায়, তবে বেইজিং মস্কোর সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর আরও গুরুত্ব দিতে পারে।
এই বিষয়টি বোঝানোর জন্য ইউক্রেনে রাশিয়াকে ‘জিততে’ সাহায্য করার কোনো প্রয়োজন চীনের নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বেইজিং চাইলে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত ও জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করার ক্ষমতা রাখে। বেইজিংয়ের প্রভাব এখন ইন্দো-প্যাসিফিকের অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত এবং ইউরোপ পর্যন্ত এমনভাবে পৌঁছেছে, যা ওয়াশিংটন উপেক্ষা করতে পারে না। তবে শি তার বৈঠকে পুতিনের সবটুকু প্রত্যাশা পূরণ করেননি।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সেখানকার তেল ও গ্যাসে চীনের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মস্কো চীনে রুশ গ্যাস আনার জন্য ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২’ নামক একটি নতুন পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুজছিল। পুতিন ও শি এই প্রকল্পের ‘বিষয়বস্তুর পরিধি নিয়ে একটি সাধারণ বোঝাপড়ায়’ পৌঁছালেও, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
তৃতীয়ত, চীন এখন নিজেকে বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখে। বহু দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘বৃহৎ ত্রিভুজ’-এর শীর্ষে অবস্থান করে চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তীতে রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করছিল।
চীন চিরাচরিত অর্থে ত্রিমুখী কূটনীতি খেলছে না। কিংবা এটি ওয়াশিংটন ও মস্কোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে না। বরং এটি নিজেকে এই ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। এটি এমন এক স্থান, যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনীতিকে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে, যদিও এর ফলাফল অনিশ্চিত।
আলেকজান্ডার কোরোলেভ: ইউএনএসডব্লিউ সিডনির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র লেকচারার; দ্য কনভারসেশন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- ডোনাল্ড ট্রাম্প
- শি জিনপিং
- ভ্লাদিমির পুতিন
