ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিরাপদ মাতৃস্বাস্থ্য

যমুনার এই চর দেশের বাইরে?

যমুনার এই চর দেশের বাইরে?
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১১:৩৯ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ১১:৪৩

সারাদেশে হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছয়শর ঘরে ছুটছে। বড়রাও সংক্রমিত হচ্ছেন। এমন সময় খবর পেলাম দুর্গম এক চরের। যেখানে শিশুর জন্মই হয় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে। একই ঝুঁকি থাকে প্রসূতির।নদীভাঙন শুধু জমির দাগ নয়; সমৃদ্ধ ইতিহাস মুছে আবারও উপহার দিয়েছে বসতির জমি। তবে তিন দশকের এই চরে এখনও মোটরসাইকেলে বসে, ঘোড়ার গাড়ির ঝাঁকিতে বা নৌকার ছৈয়ের ভেতরেও সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রসূতি। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জন্য আছে মাত্র একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। যার মূলধন ঠান্ডা-জ্বর আর চর্মরোগের সরকারি ওষুধ। 

২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুর হার ১১৫ থেকে ১৩৫ জন। ২০২৩ সালে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু লাখে ১২৩। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০ জন মায়ের মৃত্যু ঘটছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের প্রতিফলন নেই দুর্গম এই চরের। এখানকার প্রায় সব অন্তঃসত্ত্বার প্রসব হয় বাড়িতে। সামর্থ্যের খামতি আর পথের দূরত্ব তাদের ঠেলে দিচ্ছে অনিরাপদ প্রসব-পরবর্তী জটিলতায়।   

সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা সরকারের তালিকাভুক্ত ১৬টি দুর্গম এলাকার একটি। এখানকার পূর্বদিকের কয়েক ইউনিয়নের মানুষ টাঙ্গাইল হয়ে স্থলপথে যাতায়াত করতে পারেন। বিপদে পড়েছেন পশ্চিম দিকের দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারা। যমুনা নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন এই দুই ইউনিয়নের একটি ঘোড়জান। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আধা ঘণ্টার বেশি পাড়ি দিতে হয় যমুনা। এরপর মোটরসাইকেলে আরও প্রায় আধা ঘণ্টা। 

সেই বন্ধুর পথের স্মৃতি আতঙ্কজনক। গত ৩ মে নৌকায় নদী পার হয়ে মোটরসাইকেল উঠলাম। প্রতি মিনিটে তিনটি ঝাঁকি দিতে দিতে বাহন নিয়ে চলল জমির আইল, খালের পাড়, বসতির উঠান, কাদা, ঝোপঝাড়, কখনও পানির ভেতর দিয়ে। এ পথে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী বা প্রসূতি মা ২ মিনিটও বসে থাকতে পারবেন না। কিন্তু তাদের এ পথ ছাড়া গতি নেই। বর্ষাকালে এই প্রায় ১০ কিলোমিটার থাকে পানির তলায়। তখন ভরসা নৌকা। উভয় ব্যবস্থাতেই যে খরচ, তা চরের নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে সংকুলান কঠিন। জনপ্রতি যাতায়াতে অন্তত ৫০০ টাকা।  

ঘোড়জানের বরংগাইল গ্রামে গিয়ে শুনলাম, আশপাশের কয়েক ইউনিয়নের মানুষ দূরত্ব, সামর্থ্য এবং কুসংস্কারের কারণে সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে যান না। আলট্রাসনোগ্রাম করতে হলে যেতে হয় এনায়েতপুর, শাহজাদপুরে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই সময়েও এখানকার নারীদের গর্ভধারণ থেকে প্রসবের পুরো প্রক্রিয়া সনাতনী ধাত্রীবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। এতে মা ও শিশু দুজনেরই মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। 

প্রত্যন্ত এই চরে নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজন, এর উদাহরণ পাওয়া যাবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার একটি ছোট্ট উদ্যোগ থেকে। বরংগাইল গ্রামে ব্র্যাকের ‘সুস্বাস্থ্য’ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গত পাঁচ মাসে নিরাপদে সন্তান জন্ম দিয়েছেন ৯৬ জন নারী। ভর্তি ছিলেন শতাধিক। প্রতি মাসে এখানে গড়ে ১৩০ থেকে ১৫০ জন প্রসূতি সেবা নিচ্ছেন। তবে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে গত নভেম্বরে। সুস্বাস্থ্যে এখন সাতজন স্বাস্থ্যকর্মী, তিনজন মিডওয়াইফ ও একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপক পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সপ্তাহে এক দিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন। স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য খরচ ধার্য্য হয়েছে ৮০০ টাকা। ব্র্যাকের এ সেবা শুরুর আগে এই দুই ইউনিয়নের প্রসূতি মায়েদের জন্য কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। 

মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার জাতীয় গড়ের চেয়ে এখানে অনেক বেশি স্বাভাবিকভাবেই। অন্তত ঘাটে বসা মাঝি, মোটরসাইকেল চালক, গ্রামের বাসিন্দা আর সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপস্থিত সেবাগ্রহণকারীর সঙ্গে কথা বলে তেমনই স্পষ্ট হয়। অসময়ে, বিপৎসংকুল পথে শিশু জন্মদান এবং মৃত্যুর সময় উপস্থিত থাকার অনেক অভিজ্ঞতা তাদের। তবে এই শিশুমৃত্যু বা মাতৃমৃত্যুর রেকর্ড থাকছে না। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২’-এ মাতৃমৃত্যুর হার ও মাতৃমৃত্যুর কারণ তুলে ধরা হয়েছে। গর্ভাবস্থা, প্রসবকাল ও প্রসবের পর ৪২ দিনের মধ্যে মায়ের মৃত্যু হলে তা মাতৃমৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

ব্রিটিশ শাসনামলে সিরাজগঞ্জের চৌহালী ছিল অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে নীল চাষ করেছে। ১৯৮৪ সালে চৌহালী উপজেলা হয়। এককালে যে জমিতে জমিদারি ছিল, সেই চৌহালী হয়েছে এখন দুর্গম জনপদ। কেননা, এটি অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ। 

নতুন শিশুর জন্মের মতো আনন্দের খবর কি আর হয়! সেই আনন্দ মাঝেমধ্যে দুর্ভাবনা আর দুসংবাদে পরিণত হয় চৌহালীর মানুষের জন্য। চৌহালী ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মো. শাহাদাত হোসেন জানালেন, দুর্গম এই চরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। সরকার চাইলেই এখানে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হতে পারে। তিনি বললেন, এখানে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। আর চাইলে যে সম্ভব, তার উদাহরণ ব্র্যাকের ‘সুস্বাস্থ্য’। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দুর্গম এলাকাতেও কার্যকর সেবা সম্ভব। অনেক সমস্যা সহজ কিছু পদক্ষেপে কাটিয়ে ওঠা যায়। যেমন চলমান কর্মসূচি পুনর্মূল্যায়ন, মাতৃত্বকালীন এবং নবজাতকের যত্নের মান নিশ্চিতকরণ, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় ধাত্রী নিয়োগ; সর্বোপরি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ জোরদার করা। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের বসতি তিন দশকের বেশি পুরোনো এক চরে মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য এখনও সরকারি সেবা না পৌঁছানোয় সন্দেহ হয়– যমুনার এই চর কি দেশের বাইরে! তাহলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এখানে কীভাবে পৌঁছায়?

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×