সুন্দরবন
বনজীবীদের গুলি করে বন রক্ষা হবে?
পাভেল পার্থ
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে আবারও এক বনজীবী প্রাণ হারালেন বনকর্মীর গুলিতে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামে নিহতের বাড়ি। ১৮ মে খুলনা রেঞ্জের শতমুখী খালে বৈধ পাস পারমিট নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কাঁকড়া ধরছিলেন তিনি। সে সময়, নিহতের সঙ্গী জেলেদের অভিযোগ, বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রল টিম তাদের ডাক দেয়। যেতে দেরি হলে প্যাট্রল টিমের লোকেরা গুলি ছোড়ে। নৌকাতেই লুটিয়ে পড়ে আমিনুরের রক্তাক্ত দেহ। ক্ষুব্ধ বনজীবী জেলে- মৌয়ালিরা লাশ নিয়ে মিছিল করেন। বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ভাঙচুর করেন। এতে বন বিভাগের পাঁচ সদস্য আহত হন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জেলেরা অভিযোগ করেছেন, পাটকোস্টা বন অফিসের এসও বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেনের ছোড়া গুলিতে আমিনুর নিহত হন। প্রথমে অস্বীকার করলেও বন বিভাগ পরে তাদের গুলিতে নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে। তবে ব্যাখ্যা দেয়, বনরক্ষীদের সঙ্গে জেলেদের ধস্তাধস্তির সময় গুলি বেরিয়ে যায়।
আমিনুরের ঘটনায় আমার সামনে শিশিলিয়ার গুলিবিদ্ধ শরীর ভেসে ওঠে। টাঙ্গাইলের মধুপুরের দিনমজুর আদিবাসী মান্দি নারী শিশিলিয়া। শালবন থেকে ঝরা শালপাতা আর বনআলু সংগ্রহ করেন মাঝেসাঝে। ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট সকালে ফজলী দফো, ফলিদুতদের নিয়ে ঝরা শালপাতা কুড়াতে গিয়েছিলেন শালবনে। কাজের ফাঁকে রসুলপুরের এক ফলবাগানের কাছের ঝোপে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে সেখানে এসে রসুলপুর বিটের তৎকালীন বিট কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন ওই নারীদের দিকে গুলি ছোড়েন। গুলিতে রক্তাক্ত শিশিলিয়াকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসায় বেঁচে যান শিশিলিয়া, যদিও শরীরে থেকে যায় গুলির অংশ (প্রথম আলো, ২২/৮/২০০৬)। এ ঘটনায় কোনো চিকিৎসা খরচ, ক্ষতিপূরণ বা কোনো বিচার পাননি শিশিলিয়া। এখনও গরমের দিনে শিশিলিয়ার শরীরে বিদ্ধ বুলেটগুলো ফুলে ফুলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শরীরে তীব্র যন্ত্রণা হয়, মাথা ঘোরায়, কাজে যেতে পারেন না, অনাহারে দিন কাটাতে হয়।
সুন্দরবনের আমিনুরের ঘটনার সঙ্গে মধুপুরের শিশিলিয়ার ঘটনার একটা পার্থক্য হলো, শিশিলিয়ার ঘটনায় বন বিভাগ গুলি করার কথা স্বীকার করেছিল। সংবাদমাধ্যমে তৎকালীন সহকারী বন সংরক্ষক মো. জহিরুল হক জানিয়েছিলেন, কাঠ পাচার করার সময় গুলি চালালে এক কাঠচোর আহত হয় (সমকাল, ২২/৮/২০০৬)। এক পাতাকুড়ানি আদিবাসী নারী বন বিভাগের কাছে হয়ে গিয়েছিল ‘কাঠচোর’। হয়তো আমিনুরকেও বন বিভাগ ‘চোর’ বানিয়ে গুলি করার বিষয়টিকে বৈধতা দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে বন বিভাগ গরিব বনজীবী ও বনবাসীদের ওপর গুলি করতে পারে কিনা? বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশ্নটিকে আরও বৃহৎ পরিসরে স্থাপন করলে, আমাদের ভাবা দরকার, বন্দুকবাজি দিয়ে বন রক্ষা করা যায় কিনা?
প্রাণবৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র ও জলা-জঙ্গল গোলা-বারুদ দিয়ে রক্ষা করা যায় না। এ জন্য দরকার বনের সঙ্গে গভীর আত্মিক, লোকায়ত ও সংরক্ষণমূলক সম্পর্ক। বন বিভাগ কেন এখনও এই সহজ বিজ্ঞানটি আড়াল করে; বন বাঁচাতে বন্দুক-বারুদের বাজেট বরাদ্দ করে? তাও আবার নিহত আমিনুর বা ঝাঁজরা হওয়া শিশিলিয়ার কষ্টের পয়সায়।
মধুপুর শালবনে ১৯৯৬ সালের ১০ এপ্রিল জয়নাগাছা গ্রামের বিহেন নকরেককে বন বিভাগ পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে। বন বিভাগ তখনও যুক্তি দেয়, গাছ চুরি ঠেকাতে তাকে গুলি করা হয়েছে। আদিবাসী মান্দি নারীরা বনআলু তুলতে বনে গেলে বনরক্ষীরা তাদের ধর্ষণ করার চেষ্টা চালায়। সাতারিয়া গ্রামের অধীর দফো এর প্রতিবাদ করায় বনরক্ষীরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর সুন্দরবনের দুবলার চরে মাছ ধরতে যান কিছু জেলে। ২১ নভেম্বর পশুর নদের নন্দবালা এলাকায় বনরক্ষীরা তাদের বিনা অপরাধে আটক করে নির্যাতন এবং জেলেদের কাছ থেকে সব মাছ লুট করে। একই সালে সুন্দরবনে বাঘ গণনার জন্য বনে স্থাপিত ক্যামেরা ট্যাপের ক্যামেরা চুরির মিথ্যা অপবাদে শ্যামনগর ও কয়রার ১৪ জন জেলে, মাঝিকে আটক করে জেলে পাঠায় বন বিভাগ। বন বিভাগের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী মিথ্যা বন মামলা এবং বনজীবী ও বনবাসী আদিবাসীদের নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের বহু প্রমাণ ও অভিযোগ আছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা কোনো প্রতিকার পায়নি।
বন বিভাগের কেউ আক্রান্ত হলে আমরা তার পক্ষে দাঁড়াই, প্রতিবাদ করি, বিচার চাই। ২০২৪ সালে কক্সবাজারের উখিয়ার বন কর্মকর্তা সাজ্জাদুজ্জামান সজলকে হত্যা করেছিল পাহাড়খেকো সেটলার বাঙালিরা। সজলের জন্য ন্যায়বিচার চেয়ে আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম। বহু প্রমাণ আছে, আমরা চেয়েছি এই প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রকৃতিবান্ধব ও জনমুখী হোক। বনরক্ষীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, জুতা-ছাতা-টর্চলাইট-রেইনকোট বরাদ্দের জন্য বহু লেখালেখি করেছি। অথচ বন বিভাগ তার বন্দুকবাজি আর অন্যায় বন্ধ করেনি।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবার দুই বন কর্মকর্তাসহ অজ্ঞাতনামা ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বন বিভাগও বনরক্ষীদের ওপর হামলার অভিযোগে আসামিদের নাম প্রকাশ না করে আরেকটি মামলা করেছে। কিন্তু এই হামলা এবং মামলা-পাল্টা মামলা দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বাঁচানো যাবে? সুন্দরবন জাগিয়ে রাখে বাঘ, বনবিবি আর বনজীবীদের লোকায়ত ব্যবস্থাপনা। বারবার বনজীবীদের সঙ্গে বন বিভাগের নিষ্ঠুর আচরণ রাষ্ট্রের প্রতি বনজীবীদের দীর্ঘ অবিশ্বাস এবং সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এমন অন্যায় আচরণের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। আশা করি, আমিনুর হত্যা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং বনজীবী ও বন বিভাগের সমন্বয়ে আত্মনির্ভর বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবেন পরিবেশমন্ত্রী।
লক্ষণীয়, ২০১৮ সালে দস্যুমুক্ত ঘোষিত সুনদরবনে পুরোনো দস্যু আতঙ্ক ফিরে এসেছে। এখন প্রতিটি বনজীবী পরিবারকে অপহরণ আতঙ্কে থাকতে হয়। মুক্তিপণ দিয়ে অপহৃতকে গ্রামে ফিরতে হয়। বন বিভাগের বন্দুক সেখানে কার্যকর নয়। বন বিভাগের সকল কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও বয়ান থেকে সরে আসা দরকার। দরকার দক্ষতা, সৃজনশীল পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং বনমুখী দায়িত্বশীল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- পাভেল পার্থ
