ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পল্লবীতে শিশু হত্যা 

ডলারের নাম আসল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর মিলল না 

ডলারের নাম আসল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর মিলল না 
×

আসামি সোহেল বললো একটি নাম- ডলার; এ দিকে মামলার নিখোঁজ একজন অজ্ঞাত আসামি।

এস এম সাব্বির খান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৪:২১

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরেই ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকা করেছেন অনেকেই। কেউ এই ঘটনার দ্রুত বিচার চান। কেউ আবার চান শরীয়া আইন অনুসারে বিচার। কিন্তু এর মাঝেই ঢাকা পড়ে গেল মামলার সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আর বনশ্রীর মাদ্রাসায় বলৎকারের শিকার এক শিশুর মর্মান্তিক আত্মহত্যার কাহিনী।

যাহোক, জনতার দাবি দ্রুত বিচার। ১৯ মে পল্লবীর শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকেই আটক হয় আসামি সোহেল রানার স্ত্রী সম্পা। এর মাত্র ৭ ঘন্টার মধ্যে গ্রপ্তার হয় সোহেল। পরবর্তী দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতে নেওয়া, জবানবন্দী আদায়, লাশের ময়না তদন্ত, ডিএনএ প্রোফাইলিং- সব সম্পন্ন। এরই মধ্যে আদালতে দাখিল করা হয়ে গেছে অভিযোগপত্রও। আর কত দ্রুত? এর আগে বাংলাদেশে এত কম সময়ে কোনো মামলার আইনি প্রক্রিয়ায় এমন অগ্রগতির নজির নেই। 

এই যে অস্থিতিশীলতা। সরকারকে চাপের মুখে তাড়াতাড়ি কাজ করতে বাধ্য করা, এর মাঝ দিয়ে কি ঘটে গেল একবার খেয়াল করুন। ওই হতভাগ্য শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার মোট আসামি ৩ জন। যার মধ্যে একজন অজ্ঞাত আসামি। ধীরে ধীরে সে অদৃশ্য হারিয়ে গেল! সচরাচর মূল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরিচিত বা অজানা ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত না হলে মামলার আওতায় রাখতে অজ্ঞাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এমন ঘটনাও দেখা গেছে যেখানে বিশেষ কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে মামলা দায়েরের সময় স্বয়ং কর্তারাই বাদীকে দিয়ে জেনেশুনে অজ্ঞাতের তালিকায় তার নাম ঠেকে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন কিছু কিনা তা নিশ্চিত না হওয়া গেলেও পুলিশের একটি বক্তব্য কানে বাজে।

মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী ছাড়াও এই ঘটনায় আরো একজনের সম্পৃক্ততা আছে যা ওই শিশুর পরিবারের এক সদস্য আগেই নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে পুলিশের বয়ানেও তা নিশ্চিত হয়। এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য মতে- পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্য ছিল, অজ্ঞাত ওই আসামি পলাতক, তাকে ধরা যায়নি। তবে তাকে ট্রেস করা গেছে। আসামি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাও পাওয়া গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

এরপর মূল আসামি সোহেল রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিলেন। তারপরেও সেই আসামি অজ্ঞাতই! জবানবন্দির কোনো অংশে কিছুই উল্লেখ নেই। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত অভিযোগপত্রও দাখিল করে ফেললেন তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভুঁইয়া নিপুন। বিচারও শুরু। অথচ কোথাও নেই সেই অজ্ঞাতজন।

তাহলে পুলিশ যে 'ট্রেস' করলো, কাকে করলো? কার নিরাপত্তার স্বার্থে তখন তথ্য দিলো না? সেটাও জানা হলো না। আসামি সোহেল বললো একটি নাম- ডলার। তার দাবি, মূল আসামি ডলার। সেই শিশুটিকে হত্যার পর ধর থেকে মাথাটা কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। খণ্ড খণ্ড করতে চেয়েছিল, হয়ে ওঠেনি সময়ের অভাবে। এ দিকে মামলার নিখোঁজ একজন অজ্ঞাত আসামি। অন্যদিকে নিজের অবধারিত পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আসামি সোহেলের বলা সেই ডলার নামটি। দুইয়ে দুইয়ে কেমন মিলে যায় না? মিলে যায়। হয়তো মিলেই যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হিসেব মিলে যাক, আমরা সেটা চাই কিনা? বোধ করি আরো আগেই মিলে যেত যদি মিছিলে মিটিংয়ে সঠিক দাবি উত্থাপন করা হতো। রাজনীতি ভুলে নৈতিকতা মুখ্য হতো। কেন হলো না, সে প্রশ্ন তোলা থাক। এখন তারচেয়েও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সবাই। আমরা কি সাত বছরের একটা ধর্ষিত শিশুর লাশ নিয়ে বিচারের দাবি আর আইন ও প্রশাসনিক বন্দোবস্তের নামে প্রহসন সৃষ্টির মতো নির্লজ্জ হয়ে গেছি কিনা?

এস এম সাব্বির খান: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×