সমকালীন প্রসঙ্গ
আমাদের শিশুদের কেন করুণ মৃত্যু হয়?
মিলন কিবরিয়া
মিলন কিবরিয়া
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিশুর মৃত্যু শুধু তার পরিবারের বেদনার প্রসঙ্গ নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের ওপরেও অভিঘাত। সেখানে যদি দুর্ঘটনায় শিশুর প্রাণহানি হয়, প্রথমেই প্রশ্ন আসে– ত্রুটি কোথায়। মানব শিশুর পরিচর্যা শুধু জন্ম থেকে নয়; গর্ভাবস্থা থেকেই শুরু হয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় অর্ধকোটি শিশু ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রাণ হারায়। তার প্রায় অর্ধেক নবজাতক। এই মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি মধ্য ও সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক শিশু জন্মের ৫ বছরের মধ্যে মারা যায় এবং তার দুই-তৃতীয়াংশই মারা যায় জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে অর্থাৎ নবজাতক পর্যায়ে। এই দুই-তৃতীয়াংশের প্রায় অর্ধেক কমিউনিটিতেই মারা যায় এবং বাকি অর্ধেক মারা যায় হাসপাতালে বা পথিমধ্যে। এই নবজাতক অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করে জন্মের সাত দিনের মধ্যে।
সন্দেহ নেই, এর সব মৃত্যুই অগ্রহণযোগ্য। কেননা, এর অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনটি ধাপেই আমাদের আরও মনোযোগ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস করা যায় প্রসব-পূর্ববর্তী, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা প্রদানের মাধ্যমে। বিশ্বের ১০টি দেশে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে দুজনের কম মারা যায়। অথচ আমাদের দেশে এই সংখ্যা ২০-২২ জন।
দেশে নবজাতকদের মৃত্যুর মূল কারণ অপরিণত জন্মগ্রহণ, প্রসবকালীন জটিলতা, প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ বা সেপসিস, ফুসফুসের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া এবং শ্বাসকষ্ট। প্রতিরোধযোগ্য এসব কারণে শিশুমৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও গুরুতর ত্রুটি নির্দেশ করে।
অসুস্থ নবজাতকের জন্য সবসময় প্রয়োজন হয় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা। এই সেবার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রচলন রয়েছে। এ পর্যায়ে প্রাথমিক সেবা প্রদান করা হয় নবজাতকের বিশেষ পরিচর্যা ইউনিটে (স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট- এসসিএএনইউ, সংক্ষেপে স্ক্যানু)। গুরুতর ও সংকটাপন্নদের সেবা প্রদান করা হয় নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ)।
দেশের সব জেলা হাসপাতালে এখন পর্যন্ত স্ক্যানু (এসসিএএনইউ) স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজে এনআইসিইউ নেই। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ জীবিত শিশু ভূমিষ্ঠ হয়। তাদের মধ্যে প্রতি হাজারে মৃত্যুহার ২২ জন হিসাবে প্রায় ২০০ জনের জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে বিশেষ পরিচর্যায় এনআইসিইউ প্রয়োজন। বছর হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ। কিন্তু দেশে মোট এনআইসিইউ শয্যাসংখ্যার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে অনুমিত সংখ্যা ১০০০-১৫০০। এ সংখ্যা যে একেবারেই অপ্রতুল, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এনআইসিইউর পরিসর, সেই পরিসরে শয্যাসংখ্যা, যন্ত্রপাতির ধরন ও সংখ্যা, পোশাক, আচরণবিধি এবং অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে মানসম্মত নির্ধারক আছে। তা যে সর্বতোভাবে মেনে চলা হচ্ছে, এমনটি মনে করার উপায় নেই। দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে এমনিতেই চিকিৎসকের সংখ্যা কম। সেই হিসাবে নবজাতক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যে খুবই কম, তা অনুমেয়। চিকিৎসকদের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন সহায়ক জনবল যেমন নার্স ও অন্যান্য টেকনিশিয়ান। দেশে এমনিতেই রেজিস্টার্ড নার্সের সংখ্যা ডাক্তারের তুলনায় কম। এনআইসিইউতে সেবা প্রদানের জন্য প্রশিক্ষিত নার্সের সংখ্যা যে কম, তা বলা বাহুল্য। এনআইসিইউ যেহেতু একটি উচ্চ মানসম্পন্ন বিশেষায়িত সেবা সেখানে প্রশিক্ষিত জনবলের কোনো বিকল্প নেই এবং তা চিকিৎসক থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একই সঙ্গে নির্মম সত্য হচ্ছে, এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করার মতো জনবল সরকারের নেই। তাই মানহীন এনআইসিইউর অভিযোগ সবসময়ই হচ্ছে। এমনকি অনুমোদন নিয়েও সন্দেহ আছে।
সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে স্বল্প সময়ের মধ্যে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যু আমাদের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে– যে কক্ষে নবজাতকরা অবস্থান করছিল, তা হাসপাতালের সঠিক নিয়ম মেনে নির্মিত ছিল কিনা। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী সেখানে কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। বদ্ধ ঘরে এসি বন্ধ থাকলে; বায়ু চলাচলের কোনো উপায় না থাকলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হওয়া অসম্ভব নয়। এরই মধ্যে একজন নবজাতককে এনআইসিইউতে নেওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফেরত আনা হয়। কিন্তু সেই সময় কেউই ওই কক্ষের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। ভোরের দিকে সেখানে অবস্থানরত ছয় শিশুরই শ্বাসকষ্ট ও বমি ভাব দেখা দেয়। তাদের এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তাদের একজন আগের কক্ষেই মারা যায়। এনআইসিইউতে দুইজনকে মৃত শনাক্ত এবং বাকি চারজনকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। কিন্তু এই চারজনও মারা যায়। কী কারণে এই মৃত্যু, তা তদন্তাধীন।

আশ্চর্যের বিষয়, তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ময়নাতদন্তই করা হয়নি। যে কোনো যুক্তিতেই তা নিয়মের গুরুতর ব্যত্যয়। এনআইসিইউতে কোনো পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা, আমরা এখনও জানি না। এনআইসিইউ সব নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছিল কিনা, তাও অজানা।
এখন আমাদের শিশুরা অনেকভাবেই অনিরাপদ। এবারের হাম বিপর্যয় আরেকটি বিষয় আমাদের সামনে নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে। সেটি পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট), যা শিশুর বয়স ২৮ দিন অতিক্রম করলে প্রয়োজন হয়। হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করেছে সাড়ে পাঁচশর বেশি শিশু। এই শিশু সবার বয়স ২৮ দিনের বেশি। অথচ দেশে পিআইসিইউর সংখ্যা নগণ্য। ফলে যেসব শিশুর পিআইসিইউর দরকার হয় তাদের ভাগ্য ও করুণ পরিণতির ওপর নির্ভর করতে হয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, দেশে পিআইসিইউর মোট শয্যাসংখ্যা ২০০-এর বেশি হবে না।
হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ভেন্টিলেটরের অভাবের দিকটি আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে এই বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, পর্যাপ্ত সহায়ক লজিস্টিক ও যথাযথ প্রশিক্ষিত জনবল ব্যতীত তা সম্যক কার্যকর হবে না।
হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও একবার সামনে এনেছে। বিশেষত টিকাদান এবং মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুহার হ্রাসে আমাদের সাফল্য সত্ত্বেও শিশুদের অসহায় ও করুণ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ আমরা হাম জটিলতায় আক্রান্ত মরণাপন্ন শিশুদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারিনি। এই সবই আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অবহেলার খণ্ড চিত্র মাত্র। দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের এক-তৃতীয়াংশ মাত্র এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ১ শতাংশ, যেখানে সুপারিশ ৫ শতাংশ। এর পর আছে অনিয়ম, দুর্নীতি। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, স্বচ্ছতা কম হলে তার নির্মম শিকার হবে দেশের দরিদ্র অসহায় মানুষ এবং তাদের ছোট্ট শিশুটিও। এর দায় রাষ্ট্র কীভাবে এড়াবে? এত অধিক শিশুর মৃত্যুর ওজন কি রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে না?
ডা. মিলন কিবরিয়া: বক্ষব্যাধি সার্জারি বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
