ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

কক্সবাজারে দলবদ্ধ ধর্ষণ

অপরাধীরা বেপরোয়া কেন

অপরাধীরা বেপরোয়া কেন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় ডাকাতির পর এক গৃহবধূ ও তাঁহার স্কুলপড়ুয়া কন্যাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা আবারও প্রমাণ করিল– দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়াই চলিয়াছে; বিশেষত ধর্ষণ মহামারির রূপ লইতে যাইতেছে। বুধবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে এই রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটিয়াছে। ভুক্তভোগী মাতা-কন্যাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হইয়াছে। উপরন্তু ঐ গৃহবধূর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বলিয়াছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁহার ভাগনিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হইতেছে। শুধু কক্সবাজারেই নহে; ধর্ষণের ঘটনা, উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার নাটোর জেনারেল হাসপাতালে সন্তানের চিকিৎসার জন্য আসিয়া এক মাতা হাসপাতালকর্মীদের দ্বারা ধর্ষিত হইয়াছেন। একই দিনে বাগেরহাটের চিতলমারীতে অনুরূপ অপরাধের শিকার হইয়াছে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রী। উপরন্তু সোমবার গাজীপুর ও নড়াইলে দুই স্কুলছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। এই সকল যৌন নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা এমন সময়ে ঘটিয়াছে যখন ঢাকার পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আদালতে এক দম্পতির ফাঁসির আদেশ হইয়াছে। সরকারের শীর্ষ মহলের প্রত্যক্ষ তাগিদের ফলস্বরূপ অত্যন্ত স্বল্প সময়ে সংঘটিত এই বিচার ইতোমধ্যে জনপরিসরে প্রশংসা অর্জন করিয়াছে। তবে আলোচ্য ঘটনাবলি প্রমাণ করে, উক্ত দ্রুত বিচার ও রায় অপরাধীদের নিবৃত্ত করিতে পারিতেছে না। বস্তুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট তৎপর না থাকিলে শুধু আদালতের এক-দুইটা রায়ে; তাহা যত কঠোরই হউক, পরিস্থিতির কোনো ইতরবিশেষ ঘটিবে না।

কিছুদিন পূর্বে প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩১২টি। মে মাসে তাহা ছিল ৩২৬টি। সংস্থাটির মতে, বিশেষত ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি এবং আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে ক্রমবর্ধমান। অনস্বীকার্য, ধর্ষণের ঘটনা অতীত সরকারসমূহের সময়েও কম ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে কুমিল্লার কলেজছাত্রী তনু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলনের জন্ম দিয়াছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাগুরার শিশু আছিয়া অনুরূপভাবে ধর্ষিত ও হত্যাকাণ্ডের শিকারের পর সর্বত্র সাধারণ ছাত্র-জনতা রাজপথে নামিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু ইহাও সত্য, অতীতের গুরুতর অপরাধের দোহাই দিয়া এখনকার অপরাধচিত্রকে স্বাভাবিক করা যাইবে না। অতীতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পায় নাই বলিয়াই আজিকে ন্যায়বিচারের দাবি অধিকতর জোরালো হইয়াছে। আমরা জানি, ধর্ষণসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ-সংক্রান্ত আইন ও বিচার প্রক্রিয়া লইয়া বহু সমালোচনা রহিয়াছে। বারংবার তাগিদ সত্ত্বেও সেইগুলি সংশোধনের মাধ্যমে যুগোপযোগী করিবার কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে না। তদুপরি বিশেষত নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর প্রতি পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে প্রত্যাশিত সংবেদনশীলতার ঘাটতি রহিয়াছে। সন্দেহ নাই, পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীমাত্রই যেভাবে পদে পদে অবহেলা-উপেক্ষার শিকার হয়, তাহার কুপ্রভাব হইতে রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গই মুক্ত নহে। তাই পুলিশ বাহিনী ও আদালত এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হইতে পারে না। তবে যে কোনো সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয় অগ্রসর অংশের মধ্য হইতে। সেই হিসাবে আদালত তৎসহিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি উক্ত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে উহাদের ভূমিকাকে অস্বীকার করিতে পারে না। এই পরিবর্তনে জনগণের প্রতিনিধিস্বরূপ সরকারকেই নেতৃত্ব দিতে হয়।
আমাদের প্রত্যাশা, আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার যুগোপযোগী সংস্কারের সহিত পুলিশকেও অবিলম্বে বিশেষত নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সকল অপরাধ দমনে সক্ষম করিয়া তোলা হইবে। ইহার অংশ হিসেবে আলোচ্য ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগসমূহ স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হইবে। মনে রাখিতে হইবে, সুবিচারবঞ্চিত হইতে হইতে ভুক্তভোগীদের সহিত তাহাদের স্বজনেরা চূড়ান্ত হতাশায় নিমজ্জিত হইতে পারেন, যাহা এক প্রকার অরাজকতার মধ্যে দেশকে ঠেলিয়া দিতে পারে।
 

আরও পড়ুন

×