রাইট টার্ন
বাজেট প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট প্রতিবছর জুন মাসে সংসদে উপস্থাপিত হলেও এর প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে। অর্থাৎ আজকের বাজেট বক্তৃতা মূলত প্রায় এক বছরের প্রশাসনিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার ফলাফল। এই বাস্তবতার আলোকে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। যখন প্রতিবছর এপ্রিলের মাঝামাঝি বা মে মাসে বিভিন্ন সংগঠন বাজেটে তাদের দাবিদাওয়া অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সভা, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক কিংবা মানববন্ধনের আয়োজন করে, তখন সেগুলোর বাস্তব প্রভাব আসলে কতটুকু?
আমি বলছি না, এসব উদ্যোগের কোনো মূল্য নেই। জনমত গঠন সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজেটের মূল কাঠামো যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন নতুন কোনো বড় দাবি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এসব আলোচনা প্রকৃত নীতিনির্ধারণের অংশ না হয়ে আনুষ্ঠানিকতা বা দৃশ্যমানতার অনুশীলনে পরিণত হয়ে আসছে। আমরা কেন এক বছর আগেই যখন থেকে সরকার প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করে, তখন থেকেই আলোচনা শুরু করি না?
বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা বাজেটকে একটি ঘটনা হিসেবে দেখি। অথচ বাজেট আসলে একটি প্রক্রিয়া। ফলাফল হলো, আমরা প্রায়ই বাজেট বক্তৃতার দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু বাজেট তৈরির দীর্ঘ পথচলা সম্পর্কে খুব কমই আলোচনা করি।
আরও বড় সমস্যা হলো, আমরা এখনও বাজেটে থাকা উন্নয়ন বরাদ্দকে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের ফল হিসেবে দেখি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই শোনা যায়, অমুক নেতা এলাকার জন্য বাজেট থেকে এত কোটি টাকা এনে দিয়েছেন; তমুক মন্ত্রী অমুক প্রকল্প অনুমোদন করিয়েছেন; অমুক এমপি বাজেট বরাদ্দ আদায় করেছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থ কি কারও ব্যক্তিগত সম্পদ? একজন মন্ত্রী বা এমপি কি নিজের অর্থ জনগণকে দিচ্ছেন? অবশ্যই নয়। রাষ্ট্রের বাজেট জনগণের অর্থ। ফলে এর বণ্টনও হওয়া উচিত জনগণের প্রয়োজন, জাতীয় অগ্রাধিকার এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে।
ধরা যাক, দেশের ১০ জন এমপি স্বাস্থ্য উন্নয়ন বাজেট থেকে নিজ নিজ এলাকায় নতুন হাসপাতালের জন্য আবেদন করেছেন। তাহলে সিদ্ধান্ত হবে কীসের ভিত্তিতে? কে আগে আবেদন করেছেন বা কার রাজনৈতিক যোগাযোগ বেশি? নাকি সিদ্ধান্ত হবে কোথায় স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি; কোথায় মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে তীব্র এবং কোথায় একটি হাসপাতাল নির্মাণ করলে সবচেয়ে বেশি জনকল্যাণ নিশ্চিত হবে?
একই প্রশ্ন রাস্তা, সেতু, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পানি সরবরাহ কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
একটি পরিণত রাষ্ট্রে বরাদ্দের প্রশ্নে আবেদনপত্র গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই একমাত্র বিবেচ্য হওয়ার কথা নয়। বরং একই ধরনের প্রয়োজন দেশের আর কোথায় আছে, কার প্রয়োজন বেশি এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে কোথায় সবচেয়ে বেশি জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব– এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিশ্বের বহু দেশে বাজেটকে একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় মে মাসে বাজেট উপস্থাপিত হলেও তার অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক গোষ্ঠী সরকারের কাছে প্রি-বাজেট সাবমিশন দেয়। সেখানে শুধু দাবি তোলা হয় না। তথ্য, গবেষণা এবং নীতিগত যুক্তিও উপস্থাপন করা হয়।
কানাডায় পার্লামেন্টের অর্থবিষয়ক কমিটি বাজেটের কয়েক মাস আগে দেশব্যাপী মতামত আহ্বান করে। নাগরিক, স্থানীয় সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং গবেষকরা লিখিত প্রস্তাব জমা দেন। সেই মতামত বাজেট আলোচনার অংশ হয়।
যুক্তরাজ্যে বাজেট ঘোষণার বহু আগে থেকেই বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন বা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, পেশাজীবী সংগঠন এবং নাগরিক গোষ্ঠী করনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করে। এসব দেশে রাজনৈতিক বিতর্ক নেই, এমন নয়। কিন্তু একটি বিষয়ে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে। তারা বাজেটকে এক দিনের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখে না। তারা এটিকে জাতীয় পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে।
বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব এবং গড়ে তুলতেই হবে। প্রতিবছর এখানে জুলাই মাসে নতুন অর্থবছর শুরু হয়। ঠিক সেই সময় থেকেই পরবর্তী বাজেট নিয়ে জাতীয় আলোচনা শুরু হতে পারে। কোন খাতে বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? স্বাস্থ্য খাতে কোন ব্যয় মানুষের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে? শিক্ষা খাতে কোন বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে বেশি ফল দেবে? কোন অঞ্চলে অবকাঠামোগত বৈষম্য সবচেয়ে বেশি? স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কী ধরনের আর্থিক সংস্কার প্রয়োজন?
এসব প্রশ্ন নিয়ে জুলাই থেকে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু হলে সংসদ সদস্যদের ভূমিকাও বদলে যাবে। তারা শুধু নিজেদের এলাকার জন্য বরাদ্দ দাবি করবেন না। বরং বরাদ্দের নীতিমালা কতটা ন্যায়সংগত; কোন মানদণ্ডে অর্থ বণ্টন হচ্ছে এবং জাতীয় অগ্রাধিকার সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও তারা তখন আলোচনা করবেন।
এতে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তনের একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। তারা সবাইকে বোঝাবেন– উন্নয়ন কোনো ব্যক্তির দান নয়। এটি নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্রের বাজেটও কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়। এটি একটি জাতীয় সম্পদ, যা দেশের সব মানুষের কল্যাণে ব্যবহার হওয়ার কথা।
আগামী বছরের বাজেট আলোচনা আগামী বছরের মে মাসে নয়; এ বছরের জুলাই মাসেই শুরু হোক। কারণ জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সূচনা নয়। এটি বিগত এক বছরের চিন্তা, পরিকল্পনা, বিতর্ক এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রকাশ। সময় এসেছে একটি নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক;
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী
