আন্তর্জাতিক
আমেরিকার যুদ্ধগুলো কী বার্তা দেয়
তৌকির হুসাইন
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের বাইরে রাশিয়া উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে। চীনের কূটনৈতিক মর্যাদা শুধু এই অঞ্চলেই নয়, বিশ্বজুড়ে আরও বেড়েছে। আর অনেক মধ্যম শক্তি জোট গঠন করে নিজেদেরকে রক্ষার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা মিরা র্যাপ-হুপার এই যুদ্ধকে ‘মহাশক্তিধরদের আত্মঘাতী হামলা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা, কৌশল বা সুচিন্তিত লক্ষ্য ছিল না। ইরান সম্পর্কে শুধু তাঁর জ্ঞানেরই অভাব নেই, বরং সমসাময়িক বিশ্বের জটিলতা সম্পর্কেও তাঁর ধারণা খুব কম। গত বছর ভ্যানিটি ফেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস বলেছিলেন, ট্রাম্প একজন উন্মাদের মতো; তিনি কোনো ধরনের সংযম রেখে চলেন না। আর তিনি এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ– কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারবে না; সবকিছুই ছাড়িয়ে যাবেন।
ট্রাম্পের ক্ষমতার বলয় এবং পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁর ব্যক্তিগত, খামখেয়ালি ও আগ্রাসী আচরণ স্বভাবতই ঝুঁকিপূর্ণ। আর যখন এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রবণতার নিরিখে যুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিচার করা হয়, তখন তা ব্যর্থতার আশঙ্কাই বাড়িয়ে তোলে। দেশটির অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি এবং বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য এই প্রবণতাকে নিরাপত্তার জন্য এতটাই ব্যাপক সময় ও ভুলের সুযোগ দেয়, তা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় ও নীতি নির্ধারণের সতর্ক বিচার-বিবেচনাকেই বাধাগ্রস্ত করে। ঔদ্ধত্য ও অজ্ঞতা এক ভয়াবহ সংমিশ্রণ। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই– যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তিকে বিজয়ের সমতুল্য বলে মনে করে।
পরাশক্তি হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র হঠকারিতার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে, আবার বেরিয়েও এসেছে। এসব যুদ্ধ তার নিজের ও মিত্রদের জন্য নেতিবাচক পরিণতি ডেকে এনেছে। জ্যাক স্নাইডারের ‘মিথস অব এম্পায়ার: ডোমেস্টিক পলিটিকস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাম্বিশন’ বইটিতে যেমন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধগুলো সামরিক শক্তির কারণে মাত্রাতিরিক্ত অহংকার দ্বারা উস্কে দেওয়া হয় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো দ্বারা প্ররোচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণে যুদ্ধে যাওয়া তাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। মার্কিন যুদ্ধ মানে যেন ন্যায়সংগত। সাম্প্রতিক ইতিহাসে ক্ষমতার চরম মাত্রা ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে বেপরোয়া হয়ে এবং পরে ৯/১১-এর ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদীয়মান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আরও জটিল করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে দেশটি একপাক্ষিকতার আশ্রয় নিয়েছে। এর ফলে আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধগুলো ব্যর্থ হয়।
অন্তহীন যুদ্ধ বিদেশে অসন্তোষ এবং দেশে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অভিজাত-নেতৃত্বাধীন ব্যর্থ ব্যবস্থাটি এখন গণরাজনীতির সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজস্ব সমস্যা তৈরি করেছে। এটি রাজনীতিতে টাকা-পয়সা ও সংবাদমাধ্যমের প্রভাব বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নীতি এখন পুরোপুরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর রাজনীতি মানেই ক্ষমতা। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নীতি ও রাজনীতি ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন বাড়াতে একজোট হয়েছে, যা ওয়াশিংটনে এর প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে মার্কিন জননীতি প্রক্রিয়ার আরও অবনতি ঘটিয়েছে। ইসরায়েলের প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে ট্রাম্প ইরানের বিষয়ে নিজের গোয়েন্দা ও সামরিক প্রধানদের কথা না শুনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা শুনেছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নৈতিকতা বা প্রজ্ঞার কারণে যুদ্ধ থেকে সরে এসেছেন, এমন নয়। বরং সাধারণ মার্কিনিদের ওপর এর অর্থনৈতিক ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট অজনপ্রিয়তার জন্যই তিনি যুদ্ধ থেকে সরে আসছেন। সুতরাং আফগান যুদ্ধ এবং তার আগের ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেই সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই– মার্কিনিরা কখনোই পুরোপুরি জানতে পারবে না, কেন এই যুদ্ধগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। ভবিষ্যতেও বারবার যুদ্ধে জড়ানো এবং বেরিয়ে আসার জন্য এটি একটি দারুণ পথ।
তৌকির হুসাইন: সাবেক রাষ্ট্রদূত, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক; দ্য ডন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
