ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

সমাজ

চূড়ান্ত পরিবর্তনটা দরকার সংস্কৃতিতে

চূড়ান্ত পরিবর্তনটা দরকার সংস্কৃতিতে
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

অঙ্গীকারবদ্ধ সংস্কৃতিসেবীর সংখ্যা ব্যাপক না হলেও একসময় নিতান্ত কম ছিল না। আর এই অঙ্গীকারের কারণেই বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব হতো না। অন্যকে সঙ্গে নিতে হয়; সংগঠন গড়ে তোলার জন্য বিশ্বাস থাকতে হয়; সম্মিলিত উদ্যোগে এবং অনড় অবস্থানে। 

সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকারটা এখন অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। কিন্তু এমনও হয়– অঙ্গীকার নিয়ে শুরু করেন ঠিকই, কিন্তু কিছুদূর গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। হয়তোবা আপসই করে ফেলেন; রণে ভঙ্গ দেন। মতাদর্শিক অঙ্গীকারবদ্ধদের বেলায় সেটা ঘটবে, এমন সম্ভাবনা কখনোই ছিল না এবং সেটা ঘটেওনি। অঙ্গীকার না থাকলে সংস্কৃতিচর্চা বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সংস্কৃতিচর্চা অবশ্যই আনন্দের বিষয়, যেখানে বিনোদন না থাকলে উদ্যমের অভ্যন্তরে লক্ষণ দেখা দিতে পারে যান্ত্রিকতার। কিন্তু সংস্কৃতির অন্তরে যদি আদর্শবাদ না থাকে, তবে তা তো বিনোদনই হয়ে উঠবে একবারে সত্য, এবং সমস্ত কিছুই পর্যবসিত হয় স্থূল ভোগবাদিতায়; অঙ্গীকারবদ্ধ সাংস্কৃতিক জগতে ভোগবাদিতা প্রধান হবে, এটা অকল্পনীয়। সংস্কৃতির নামে যারা বিনোদন বিক্রি করে আসলে তারা সংস্কৃতিসেবী নয়; সংস্কৃতি ব্যবসায়ী। 
সংস্কৃতির অঙ্গীকারটা কী? সেটা হলো গণসংস্কৃতির বিকাশের। আমরা লোকসংস্কৃতির কথা খুব শুনি। লোকসংস্কৃতি ও গণসংস্কৃতি কিন্তু এক ব্যাপার নয়; দুয়ের ভেতর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। লোকসংস্কৃতি হচ্ছে যেমন আছে তেমন থাকার সংস্কৃতি, আর গণসংস্কৃতি হচ্ছে সব বিকাশের। লোকসংস্কৃতি বিশেষ জনগোষ্ঠীর; গণসংস্কৃতি সকল মানুষের। এক কথায়, গণসংস্কৃতি হচ্ছে অগ্রগামিতার সর্বজনীনতার এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিকতার। 

গণতান্ত্রিকতাই গণসংস্কৃতির মূল বিষয়। সব কাজই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পক্ষে। এটি সেই সংস্কৃতি, যা মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর সংরক্ষণ ও বিকাশ চায়। সমাজকে নিয়ে যেতে চায় রূপান্তরের অভিমুখে। 

আমাদের দেশে নানা রকম বিপ্লব ঘটেছে বলে প্রচার আছে। সরকারের বদল হয়েছে; রাষ্ট্রের উত্থান ও পতন চোখের সামনেই ঘটেছে; অতি দ্রুতগতিতে ধনবান হয়েছে কেউ কেউ; নেমে গেছে অনেকে। কিন্তু সমাজ বদলায়নি; রয়েছে সেই আগের মতোই অস্বাস্থ্যকর ও নিপীড়নমূলক। সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু হয়েছিল যে ধরনের সামাজিক সম্পর্ক; ভোল ও লেবাস পাল্টে সেটাই রয়ে গেছে এখনও। 
মানুষ সমাজেই বসবাস করে; শূন্যে নয়। সমাজে রয়েছে বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র– সকলেই পীড়ন করছে ব্যক্তিকে। দুর্বল প্রতিনিয়ত পীড়িত হচ্ছে সন্ত্রাসীদের হাতে। নির্লজ্জতা সকল সীমা অতিক্রম করেছে। এখন বর্বরতার প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল বর্বরতাই। মাদকাসক্তি ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নতির হই-হুল্লোড় চাপা দিতে চাচ্ছে মানুষের কান্নাকে। কিন্তু মানুষের অশ্রু মোছে না; সে কেবল বাড়েই। 

এই ব্যবস্থার পরিবর্তন যে দরকার, সেটা অনেকেই বোঝেন। কিন্তু ওই লক্ষ্যে কাজ করেন না। প্রকৃত সংস্কৃতিবানরা নিশ্চয় তা করেন। আর সে জন্যই তারা ভিন্ন রকমের মানুষ। সমাজ পরিবর্তনের মূল সংগ্রাম অবশ্যই রাজনৈতিক। রাষ্ট্রের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আবশ্যক, যেটা ঘটেনি। রাষ্ট্র বদলেছে, কিন্তু তার স্বভাব বদলায়নি। বর্তমানে সে হয়ে দাঁড়িয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান। বিশ্বসন্ত্রাসী সাম্রাজ্যবাদের সে স্থানীয় প্রতিনিধিও বটে। যার নির্লজ্জ নমুনা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গোপন বাণিজ্য চুক্তি। দেশবিরোধী এই চুক্তি পক্ষান্তরে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যে বিকিয়ে দিয়েছে– আমরা তা বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। এর দায় ঘৃণিতরা দেবে না। দেবে দেশের সমষ্টিগত মানুষ। দেশের দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল যে কাজ করছে, সেটা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সন্ত্রাসী লড়াই ভিন্ন অন্য কিছু নয়। তারা রাষ্ট্রের স্বভাব-চরিত্রে পরিবর্তন আনবার ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী নয়। তাদের লক্ষ্য বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ন রেখে যতটা পারা যায় দু-হাতে দখল করা। সামাজিক পরিবর্তন এই রাজনীতি দিয়ে হবে না। তার জন্য ভিন্ন রাজনীতির দরকার হবে। 

চূড়ান্ত পরিবর্তনটা কিন্তু সংস্কৃতিতেই দরকার। রাষ্ট্র বদলায়, সমাজ বদলায় না– এ অভিজ্ঞতা তো আমাদের অত্যন্ত প্রত্যক্ষ। কিন্তু এমনকি সমাজ বদলালেও যে সংস্কৃতি বদলাবে– এমনটা বলা যাবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই খোলা রয়েছে। সেখানে রাষ্ট্র বদল হয়েছিল, সমাজ বদলেছিল এবং সংস্কৃতিতেও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল রূপান্তরের। কিন্তু শেষের ওই কাজটি সুসম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তার আগেই গোটা আয়োজন ভেঙে পড়েছে। ভাঙবার একটি প্রধান কারণ কিন্তু আবার ওই সাংস্কৃতিক দুর্বলতাই। 

পরিবর্তনের কাজটি সোজা নয়। রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন দরকার হবে; আবশ্যক হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সব মিলিয়ে আন্দোলন হবে একটিই– নতুন সমাজ গড়বার। তাতে অঙ্গীকারবদ্ধ সংস্কৃতিকর্মীরা থাকবেন। তাদের লক্ষ্য হবে অধিকতর অগ্রসর-সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা। 

আজকের পৃথিবীতে সংস্কৃতির মূল শত্রু পুঁজিবাদ, যার তৎপরতা বিভিন্নমুখী। যেমন সে বস্তুগত তেমনি আদর্শিক। বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, লগ্নিপুঁজির কারবার, অস্ত্র, মাদক ও পর্নোগ্রাফির ব্যবসা– কোথায় সে নেই! দখল করে রেখেছে গণমাধ্যমকে। আদর্শিকভাবে মানুষকে করে তুলছে মুনাফালোভী ও ভোগবাদী। পুঁজিবাদের সমস্ত তৎপরতাই সংস্কৃতিবিরোধী, যদিও সে ভান করে সংস্কৃতিমনস্কতার। তার চেহারা সর্বত্রই উন্মোচিত। সাম্প্রতিককালে একটু বিশেষভাবেই উন্মোচিত হয়েছে ইরানবাসীর ওপর জায়নবাদী ইসরায়েল ও মার্কিনি বাহিনীর আগ্রাসনে। 

পুঁজিবাদকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না করলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বিকশিত করার আন্দোলন অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়তে বাধ্য। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে প্রকৃত প্রাণ আসে লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, তবেই। নইলে নয়। সেই লক্ষ্য অর্জনের অংশ থাকবে; অংশ থাকবে প্রত্যাখ্যানের। আমরা হইজাগতিক ও সর্বজনীন যে সংস্কৃতি গড়তে চাই, সেটা ইতিবাচক দিকনির্দেশ, কিন্তু তার সঙ্গে থাকতে হবে পুঁজিবাদ-বিরোধিতা। দুয়ে মিলেই এক আসলে। 

ব্রিটিশ আমলে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ তথা পুঁজিবাদ-বিরোধিতার একটা বড় ধারা ছিল। ১৯৪৭-এর পর ওই ধারা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু তার চেতনা একেবারে একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রে জেগে উঠেছিল পাকিস্তানি নব্য ঔপনিবেশিক দুর্গে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে পুঁজিবাদবিরোধী ধারা দুর্বল হয়ে গেছে। দুই কারণে। প্রথম কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে গেছে পুঁজিপন্থিদের হাতে। দ্বিতীয় কারণ সোভিয়েত শিবিরে একটা ধস নেমেছে। পুঁজিপন্থিদের ক্ষমতা-দখল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একেবারে সরাসরি বিরোধিতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। বিভিন্ন নামে এই শক্তিই রাষ্ট্র দখল করে রেখেছে। তারা মানুষকে পীড়ন করছে। তাদেরকে বিভ্রান্ত করছে।

মানুষের জীবনে এখন নিরাপত্তার বড়ই অভাব। সেই নিরাপত্তাহীনতা আর যাই করুক, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চায় ব্রতী করে না। তবুও অঙ্গীকারবদ্ধ অনেকেই যে আছেন, এটা একটা বড় রকমের ভরসা বৈ কি। তারা দৃষ্টান্ত যেমন, তেমনি অনুপ্রেরণার বীজ। ব্যক্তিগতভাবে তাদের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন কম সহ্য করতে হয়নি এবং হচ্ছে না, সেটাও অসত্য নয়। বিরূপ বিশ্বের এই সাহসী মানুষেরা অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করুক। এটাই প্রত্যাশিত। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×