ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

সাদা কালো

বিপর্যয়ের মধ্যে উচ্চাভিলাষী বাজেট

বিপর্যয়ের মধ্যে উচ্চাভিলাষী বাজেট
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ১৩:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন সরকারের নতুন বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ হলো। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করলেন। বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই তিনি জানালেন, দেশে সবার অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশসহ ১০টি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। বেশ ভারি ও মনোহারী কথামালা। শুনলেই মন জুড়িয়ে যায়। তবে এ লক্ষ্য বাজেট নিয়ে আলোচনাকেও সহজ করে দিয়েছে। পুরো বাজেট বক্তৃতা কষ্ট করে ঘাঁটতে হয় না। শুধু পলিসি ও বরাদ্দগুলো দেখলেই বলে দেওয়া যাবে, তা কতটুকু লক্ষ্যাভিমুখী।

তবে আপাতত মোট বাজেট ও বাজেটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ হিসাব খতিয়ে দেখা যেতে পারে। কিছুদিন আগে যখন খবর বের হলো, সরকার চলতি অর্থবছরের চেয়ে এক লাখ ৪৮ হাজার কোটির টাকা বেশি খরচের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, এত বড় বাজেট কেন? প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় অবশ্য এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। সরকার আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিকে সাড়ে ৬ শতাংশ বাড়াতে চায়, যদিও গত তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ৪-এর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যও এবার বেশ বড়– ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব আয় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা হবে বলা হলেও বাস্তবতা, প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার ওপরে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সরকারের হাতে কী এমন জাদু আছে, যার ভেল্কিতে আয়-ব্যয়ের এ বিশাল ফারাক পূরণ হবে?

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ চার বছর ছাড়া বাকি সময় দেশ বেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যও বেশ চাঙ্গা ছিল। কিন্তু তখনও রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বাড়েনি। রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধিও ১৭ শতাংশের বেশি হয়নি। কিন্তু এবার সরকার রাজস্ব আহরণে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি চাচ্ছে। এমন এক সময়ে এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছে যখন অর্থনীতির গতি মন্থর, শিল্প উৎপাদন ব্যাপক চাপের মুখে, ব্যবসা-বাণিজ্য কোনোমতে চলছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যবসার জন্য যা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেই ট্রাস্ট বা আস্থা সর্বস্তরেই অনেক কমে গেছে। সরকার বলছে বটে– পর্যাপ্ত জ্বালানি-বিদ্যুতের সরবরাহ থাকবে, কিন্তু তা কি রাতারাতি নিশ্চিত করা যায়?

সরকার করভিত্তি সম্প্রসারণ করার কথা বলছে। সংস্কারের আলাপ আগের সরকারের মতোই আওড়াচ্ছে। কিন্তু গত তিন মাসে কি এর কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে? এগুলো কীভাবে হবে, সে আলাপ কিন্তু বাজেট বক্তৃতা বা অন্য কোথাও নেই।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন বাজেটে প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে; জিডিপির শতাংশের হিসাবে তা কম মনে হলেও দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বাজেট ঘাটতি। রাজস্ব আয় কম হলে বছর শেষে তা আরও বাড়বে, এটা বলা যায়। আর এই ঘাটতি পূরণে পূর্বসূরির মতোই সরকার ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে। এতে একদিকে বেসরকারি ঋণ প্রবাহে ভাটার টান থেকে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে, অন্যদিকে ঋণের সুদ পরিশোধের দায় আরও বাড়বে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ অর্থ চলে যাবে শুধু সুদ পরিশোধে।

বাজেটের আকার বড় করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হয়। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলে, রাজস্ব সংগ্রহের বাস্তবতা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা তেমন আশাব্যঞ্জক নয। গত ২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ শতাংশ। বিদায়ী বছরের প্রথম ৯ মাসে তা ৫২ শতাংশ। সত্য, ইতোপূর্বে ছিল অন্তর্বর্তী সরকার, এখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। কিন্তু প্রশাসন বা জনবল তো প্রায় একই আছে। এর মধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়ানো হয়েছে বা বেছে বেছে মেধাবী ও দক্ষ লোকদের সেখানে বসানো হয়েছে, এমন কোনো ঘটনাও ঘটেনি। 

সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাস্তবে মূল্যস্ফীতি এখনও ২ অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে। পদক্ষেপ যা নেওয়া হয়েছে তা এককথায় সমুদ্রে বিন্দুবৎ। চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর সামান্য পরিমাণ কমিয়ে কোনো লাভ হয় না– তা বারবার প্রমাণিত। দরকার ছিল বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ, সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু এমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার সঙ্গে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড চালুর ঘোষণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও ভালো।

ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের সীমা বাড়ানো, আয়কর অবকাশের সীমা, সারাবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রেখে নির্ধারিত সময়ে তা দিলে ৫ শতাংশ রিবেটের সুযোগ ইত্যাদি ইতিবাচক। মোবাইল সিমের ওপর ৩০০ টাকা কর তুলে নেওয়াও ভালো।

পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জনগণের অংশগ্রহণে বনায়ন কর্মসূচিকে সবুজ বিপ্লবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি নদনদীর নাব্য পুনরুদ্ধার এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর কথাও বলা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে জীবন চক্রভিত্তিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশু থেকে প্রবীণ– সব বয়সী ও সব স্তরের নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা অর্থমন্ত্রী বলেছেন।

কিন্তু বন্দুকে যদি বারুদই না থাকে, তাহলে বন্দুকের কার্যক্ষমতা কি থাকে? তেমনি অর্থায়নের চলমান সমস্যার সমাধান না হলে শেষ পর্যন্ত সকলই গরল ভেল!

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাবে বলেছেন, ‘উচ্চাভিলাষ না থাকলে, আকাঙ্ক্ষা যদি বেশি না হয়, তাহলে উন্নয়নের দিকে যাওয়া যাবে না। বিশেষ করে বিগত দিনে দেশ যতটুকু পিছিয়েছে, সেখান থেকে স্যালভেজ করে সামনের দিকে যেতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে।’ কিন্তু একটা বিপর্যস্ত অর্থনীতির ‘স্যালভেজ’ কি রাতারাতি আশা করা যায? তার জন্য যে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ দরকার; তাও বা কোথায়?

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×