জনস্বাস্থ্য
জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে রাষ্ট্রের করণীয়
বিশ্বের উন্নত ব্যবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স হলো চলমান চিকিৎসা ইউনিট
মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন পাভেল
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ১৯:৫৫
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ব্রিজের কাছে এক ব্যস্ত বিকেল। যানজটের শব্দে শহর হাঁপাচ্ছে। হঠাৎ ভিড়ের মাঝ থেকে আতঙ্কিত চিৎকার– ‘মানুষটা পড়ে গেছে! কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন!’ একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ রাস্তার পাশে লুটিয়ে পড়েছেন। স্ট্রোক। মানুষ ছুটে আসে, পানি আনে, মালিশ করে, ফোনে অ্যাম্বুলেন্স খোঁজে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স আসে না। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে।
এই দৃশ্য কোনো ব্যতিক্রম নয়। গাজীপুরের মহাসড়কে আহত শ্রমিক, কুড়িগ্রামের প্রসব জটিলতায় পড়া মা, সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশু– সবাই একই বাস্তবতার মুখোমুখি। বাংলাদেশে বহু মানুষের বাঁচা-মরা হাসপাতালের দরজায় পৌঁছানোর আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর মতো সমন্বিত রাষ্ট্রীয় জরুরি চিকিৎসা অবকাঠামো এখনও কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। এটি কেবল স্বাস্থ্য খাতের ঘাটতি নয়; এটি জননিরাপত্তার কাঠামোগত ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পালনে গুরুতর শূন্যতা।
নীরব মৃত্যুমিছিল ও গোল্ডেন আওয়ার এবং উদাসীনতার মূল্য
আমরা অগ্নিকাণ্ড, অবকাঠামোগত বিপর্যয় বা রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করি। অথচ সড়কে প্রতিদিনের মৃত্যু, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, প্রসব জটিলতা, নবজাতক ও শিশুদের জরুরি সংকট– এসব ক্ষেত্রে প্রি-হসপিটাল চিকিৎসার অভাব নিয়ে জাতীয় ক্ষোভ ততটা দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে বলে যে পরিসংখ্যান আলোচনায় আসে, তার বাইরেও আছে অসংখ্য অদৃশ্য মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতা।
জরুরি চিকিৎসায় প্রথম ৬০ মিনিট, অর্থাৎ ‘গোল্ডেন আওয়ার’, রোগীর বেঁচে থাকা ও স্থায়ী ক্ষতি এড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এই মূল্যবান সময় নষ্ট হয় বিলম্ব, যোগাযোগের ঘাটতি, অসংগঠিত পরিবহন, প্রি-হসপিটাল চিকিৎসার অভাব এবং হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে। প্রতিটি দেরির আড়ালে রয়েছে ভেঙে যাওয়া পরিবার, উপার্জনক্ষম সদস্য হারানো সংসার, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কিংবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করা তরুণ–যাদের মানবিক মূল্য কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। কঠোর বাস্তবতা হলো– জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে কারও বেঁচে থাকা এখনও অনেক ক্ষেত্রে ভাগ্য, অর্থ এবং অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। এটি সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মৌলিক মানবাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
অ্যাম্বুলেন্স এখনও কেবল গাড়ি
বিশ্বের উন্নত ব্যবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স হলো চলমান চিকিৎসা ইউনিট। রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অক্সিজেন, পর্যবেক্ষণ, প্রাথমিক ওষুধ, শক ব্যবস্থাপনা, ট্রায়াজ এবং হাসপাতালের আগাম প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক অ্যাম্বুলেন্স এখনও কার্যত রোগী বহনের যানবাহন মাত্র। নেই একক জরুরি নম্বর, নেই কেন্দ্রীয় কল-ডিসপ্যাচ, নেই জিপিএসভিত্তিক নিকটতম উপযুক্ত যান নির্বাচন, নেই মানসম্মত প্রি-হসপিটাল গাইডলাইন, নেই হাসপাতালের সঙ্গে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়।
ফলে সংকটের মুহূর্তে পরিবারকেই অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে হয়, হাসপাতাল বাছতে হয়, রাস্তা সামলাতে হয় এবং রোগীর অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতে হয়। এই ব্যবস্থা অমানবিক, অদক্ষ এবং ব্যয়বহুল। ফলে অ্যাম্বুলেন্সগুলো একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো কাজ করে। এর করুণ ও অবধারিত পরিণতি হলো– সহজেই বাঁচানো যেত এমন হাজারো মানুষের অকালমৃত্যু, চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ এবং সীমাহীন দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ ।
প্রয়োজন জাতীয় জরুরি চিকিৎসাসেবার রূপরেখা
একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় জরুরি চিকিৎসাসেবা গড়ে তুলতে হবে। এটি হবে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ভিত্তিক একীভূত ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত– যেখানে জরুরি কল গ্রহণ, রোগীর অবস্থাভিত্তিক ট্রায়াজ, জিপিএসভিত্তিক নিকটতম উপযুক্ত যান পাঠানো, প্রি-হসপিটাল চিকিৎসা এবং হাসপাতালের সঙ্গে আগাম সমন্বয় একই নেটওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত হবে।
একটি ফোন কল, একটি নেটওয়ার্ক, একটি জীবনরেখা– এই হওয়া উচিত জরুরি চিকিৎসার ভিত্তি। একজন নাগরিক এক নম্বরে ফোন করবেন; প্রশিক্ষিত কল-টেকার রোগীর অবস্থা বুঝে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন; নিকটতম উপযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স, মোটরবাইক রেসপন্ডার বা বিকল্প যান পাঠানো হবে; হাসপাতালকে আগেই জানানো হবে; প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক রোগীকে স্থিতিশীল করে নিয়ে যাবে।
এটি কোনো কল্পনা নয়। বিশ্বের বহু দেশে এটি বাস্তবতা। বাংলাদেশেও এটি বাস্তবায়নযোগ্য, যদি নীতিনির্ধারণ, অর্থায়ন, জনবল এবং প্রযুক্তিকে একটি অপারেশনাল কাঠামোর অধীনে আনা যায়– আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাস্তবসম্মত প্রয়োগ।
প্রযুক্তি, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও জনবল– বাস্তবতানির্ভর ভিন্নধর্মী সমাধান
কার্যকর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থায় থাকতে হবে কেন্দ্রীয় জরুরি নম্বর, জিপিএস ট্র্যাকিং, কম্পিউটার-সহায়ক ডিসপ্যাচ, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের কন্ট্রোল রুম, হাসপাতালের সক্ষমতা দেখার ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড এবং রোগী রেফারেল ট্র্যাকিং। রোগীকে শুধু দ্রুত নয়, সঠিক স্থানে এবং সঠিক অবস্থায় পৌঁছে দিতে হবে। ভুল হাসপাতালে দ্রুত পৌঁছানোও অনেক সময় জীবন বাঁচায় না।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা একরৈখিক নয়। শহরের যানজট, গ্রামের বিচ্ছিন্নতা, চরাঞ্চল, নদীপথনির্ভর এলাকা এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল– সব জায়গায় একই মডেল কাজ করবে না। শহরে মোটরবাইক রেসপন্ডার, গ্রামে স্বল্পব্যয়ী অ্যাম্বুলেন্স বা ট্রাইসাইকেলভিত্তিক যান, নদী ও চরাঞ্চলে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এবং বন্যাকালে বিশেষ রেফারেল পথ দরকার। সেবা হতে হবে স্থানভিত্তিক, প্রয়োজনভিত্তিক এবং বাস্তবতানির্ভর।
তবে যানবাহনই সেবা নয়। প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া কোনো জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা টিকবে না। ইমার্জেন্সি মেডিকেল টেকনিশিয়ান, প্যারামেডিক, ডিসপ্যাচার, প্রশিক্ষিত চালক, হাসপাতালভিত্তিক জরুরি কর্মী এবং কমিউনিটি ফার্স্ট রেসপন্ডার– এই পুরো মানবসম্পদ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণ কাঠামো হতে হবে দক্ষতাভিত্তিক, সময়োপযোগী ও ধারাবাহিক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই– এই অজুহাতে সংস্কার থামিয়ে রাখা যাবে না। বিদ্যমান নার্স, মেডিকেল টেকনিশিয়ান, ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও জুনিয়র স্বাস্থ্যকর্মীদের তিন থেকে ছয় মাসের দক্ষতাভিত্তিক নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত একটি সম্মুখসারির জীবনরক্ষাকারী বাহিনী তৈরি করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হবে ধাপে ধাপে; কিন্তু জীবনরক্ষাকারী প্রথম সাড়া আগামীকাল থেকেই শুরু করা যায়। শুরু হোক ছোট আকারে, বিস্তার ঘটুক দ্রুত।
হাসপাতালের ভেতরেও সংস্কার জরুরি
বাহিরের জরুরি সাড়া কার্যকর হলেও হাসপাতাল প্রস্তুত না থাকলে রোগী কেবল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরবে। সেটি চিকিৎসা নয়; সেটি বিলম্বের আরেক রূপ। তাই জরুরি বিভাগের ভেতরেও কাঠামোবদ্ধ ট্রায়াজ, গুরুতর ও অগুরুতর রোগীর পৃথক জোন, প্রোটোকলভিত্তিক চিকিৎসা, স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ইউনিট এবং রোগীপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। এতে ভিড় কমবে, চিকিৎসা দ্রুত হবে এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়বে। অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালকে একই অপারেশনাল চক্রে আনতে না পারলে জাতীয় জরুরি সেবা পূর্ণতা পাবে না।
ব্যয় নয়, বিনিয়োগ
জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যয় নয়; এটি জীবনরক্ষা, উৎপাদনশীলতা এবং স্বাস্থ্যব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিনিয়োগ। প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমলে পরিবার বাঁচে, কর্মক্ষম মানুষ বাঁচে এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার সামাজিক ব্যয় কমে। দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা জটিলতা কমায়, দীর্ঘদিন ভর্তি থাকার প্রয়োজন কমায় এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর চাপ হ্রাস করে। আরও বড় বিষয় হলো, একটি মানসম্মত সরকারি জরুরি সেবা অনিয়ন্ত্রিত, ব্যয়বহুল ও অনেক সময় শোষণমূলক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সনির্ভরতা কমাতে পারে। সাধারণ মানুষের পকেট থেকে হওয়া অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় কমবে।
একই সঙ্গে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান– প্যারামেডিক, ডিসপ্যাচার, চালক, প্রশিক্ষক, সুপারভাইজার, অপারেশন ম্যানেজার, ডেটা অ্যানালিস্ট এবং জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার নানা পেশায়। এটি দেশের যুবশক্তিকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আমাদের হাসপাতাল আছে, অ্যাম্বুলেন্স আছে, স্বাস্থ্যকর্মী আছে, প্রযুক্তিও আছে। যা নেই, তা হলো কেন্দ্রীয় সমন্বয়, আইনগত স্বীকৃতি, জাতীয় কর্তৃপক্ষ, মানসম্মত অপারেশনাল প্রোটোকল, কর্মদক্ষতার সূচক এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাস্টারপ্ল্যান। ছড়িয়ে থাকা সম্পদকে একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থায় রূপ দেওয়াই এখন মূল কাজ।
বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত যে একটি সমন্বিত জরুরি চিকিৎসাসেবা শুধু জীবন বাঁচায় না– এটি অর্থনৈতিক সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ায়। এর রোডম্যাপ পরিষ্কার এবং এর রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। এখন প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের দৃঢ়, সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
ডা. মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন পাভেল: স্টাফ স্পেশালিস্ট, ভার্চুয়াল ক্লিনিক্যাল কেয়ার সেন্টার, অ্যাম্বুলেন্স, অস্ট্রেলিয়া; সিনিয়র অ্যাডজাঙ্কট লেকচারার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, মোনাশ ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
[email protected]
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য
- জনস্বাস্থ্য
- চিকিৎসা