বাংলা কিউআর
সস্তা লেনদেনের প্রতিশ্রুতি বনাম ব্যয়বহুল বাস্তবতা
এম এম মুসা
এম এম মুসা
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) প্ল্যাটফর্মের আওতায় বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক মার্চেন্ট পেমেন্টের জন্য সর্বনিম্ন মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই হার শুধু বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক মার্চেন্ট পেমেন্টের জন্য প্রযোজ্য হবে, অন্য সব বিদ্যমান মাশুল অপরিবর্তিত থাকবে। একই দিনে সরকারি রাজস্ব ও ফি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এমডিআর ১ শতাংশে সীমিত রাখার আরেকটি প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি উদ্যোগ; যা মূলত নগদবিহীন, সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা কি এখন নিজ উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে?
গোড়ার কথা: বাংলা কিউআরের যাত্রা হয়েছিল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যয় কমিয়ে আনবে বলে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের (মাইক্রো-মার্চেন্ট) জন্য এমডিআরের ঊর্ধ্বসীমা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ক্ষেত্রে ০.৫০ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের (পিএসপি) ক্ষেত্রে ০.৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। এর আগে সাধারণ মার্চেন্ট পেমেন্টের জন্য ঊর্ধ্বসীমা ছিল ০.৭০ শতাংশ, আর অন্যান্য পেমেন্টের জন্য ১.৬০ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের নতুন নির্দেশনা; যেখানে সর্বনিম্ন হারই বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১ শতাংশে। প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মাশুলের বোঝা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হলো। এটি নিছক একটি প্রযুক্তিগত সমন্বয় নয়; এটি নীতিগত দিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে; যেখানে ‘সর্বোচ্চ সীমা’ থেকে সরে গিয়ে ‘সর্বনিম্ন সীমা’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মাশুল কমার সম্ভাবনাকেই কার্যত রুদ্ধ করে দিল।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) প্রতি মাসে এক হাজার ৪০০ কোটিরও বেশি লেনদেন পরিচালনা করে। ২০২০ সাল থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়ী লেনদেনে শূন্য মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কার্যকর রয়েছে এবং আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ নীতিকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ও সেবাদাতাদের ক্ষতিপূরণ সরকার বাজেট থেকে ভর্তুকির মাধ্যমে দেয়। অন্যদিকে ব্রাজিলের পিক্স ব্যক্তি পর্যায়ে বিনামূল্যে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য মাত্র ০.৩৩ শতাংশ মাশুলে পরিচালিত হয়, যা প্রচলিত কার্ড লেনদেনের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় গড়ে ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ত্বরান্বিত হয়েছে।
অবশ্য ভারতে শূন্য-এমডিআর মডেলের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ সরকারি ভর্তুকি প্রকৃত ব্যয়ের মাত্র ১১ শতাংশ বহন করছে। তবু ভারত ও ব্রাজিল প্রথমে ভর্তুকি ও অত্যন্ত কম মাশুলের মাধ্যমে ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে, পরে স্থায়িত্বের প্রশ্ন বিবেচনা করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের আগেই তুলনামূলক উচ্চ মাশুল আরোপ করছে, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
মাশুলের বোঝা কার কাঁধে?: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী এমডিআর খরচ ক্রেতার ওপর চাপানো যাবে না। নীতিটি ভোক্তা সুরক্ষামূলক হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তব চাপ তৈরি করে, কারণ তাদের মার্জিন কম। ফলে ব্যবসায়ীরা হয় দাম বাড়ায়, নয়তো নিজে খরচ বহন করে, অথবা নগদ লেনদেনে ফিরে যায়। এতে ডিজিটাল পেমেন্ট প্রসার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার নগদবিহীন ব্যবস্থার জন্য খরচ বণ্টন নিয়ে নীতি-সমন্বয় দরকার। যেমন–টায়ার্ড এমডিআর বা সরকারি প্রণোদনা, যা দীর্ঘ মেয়াদে ডিজিটাল অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতির খরচ বণ্টন সঠিকভাবে না হলে নগদ ব্যবহারে প্রত্যাবর্তন বাড়তে পারে এবং অসম প্রভাব তৈরি করতে পারে।
এটি একটি ক্ল্যাসিক দ্বিমুখী বাজার ব্যবস্থার সমস্যা। পেমেন্ট নেটওয়ার্কের একদিকে ভোক্তা, অন্যদিকে ব্যবসায়ী–উভয়ের অংশগ্রহণ ছাড়া নেটওয়ার্ক কার্যকর হয় না। ভারত ও ব্রাজিল উভয়েই বুঝেছিল যে প্রাথমিক পর্যায়ে উভয়পক্ষকে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে এ সেবা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রজ্ঞাপনে ‘প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন’ চালানোর অনুমতি দিয়েছে বটে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো কাঠামোগত ভর্তুকি বা প্রণোদনা নেই।
বাধ্যতামূলক গ্রহণ ও প্রতিযোগিতাহীন মূল্য নির্ধারণ: বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংক, এমএফএস সেবা প্রদানকারী ও পিএসপিকে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে নিজস্ব কিউআর কোড প্রত্যাহার করে শুধু বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে; অন্যথায় সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ফলে বিকল্প কিউআর অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে। একই সঙ্গে যদি এই একক প্ল্যাটফর্মের সেবা মাশুলও নিয়ন্ত্রক নির্ধারণ করে, তবে মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা সীমিত হতে পারে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কম মাশুল নির্ধারণের সুযোগ সংকুচিত হয়। প্রতিযোগিতা নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একচেটিয়া অবকাঠামো ও কেন্দ্রীয় মূল্য নির্ধারণের এই সমন্বিত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করে।
করণীয়: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ন্যায্য পেমেন্ট চার্জ কাঠামো প্রয়োজন। প্রথমত, তাদের লেনদেনের আকার অনুযায়ী স্তরভিত্তিক এমডিআর ব্যবস্থা চালু করা উচিত, যাতে ছোট ব্যবসায়ীরা কম বা শূন্য চার্জে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করতে পারেন, আর বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত ব্যয় বহন করে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও এমএফএস সেবাদাতাদের অবকাঠামো ব্যয় কমাতে সরকারি ভর্তুকি বা প্রণোদনা তহবিল গঠন করা দরকার। তৃতীয়ত, এমডিআর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিয়মিত পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ফি বাস্তব পরিচালন ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এসব পদক্ষেপ ডিজিটাল লেনদেনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করবে।
এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
- বিষয় :
- প্রযুক্তি
- বাংলা কিউআর
