ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালিই এখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু
আবদুল্লাহ বান্দার আল-ইতাইবি
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত মঙ্গলবার ওমানি জলসীমা অতিক্রম করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়। উপসাগরীয় দেশগুলো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানকে দায়ী করেছে। এর জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়। যার পাল্টা জবাবে তেহরানও বাহরাইন ও কুয়েতে আঘাত হানে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি বাতিল হয়ে গেছে।
উত্তেজনার এই সর্বশেষ চিত্রটি স্পষ্ট করে দেয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের মূল কেন্দ্রে চলে এসেছে এই হরমুজ প্রণালি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এই প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিমত নিরসন করাই সবচেয়ে কঠিন প্রমাণিত, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিবিষয়ক প্রশ্নগুলো আপাতত এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে ইরান, উপসাগরীয় প্রতিবেশী এবং সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি তাৎক্ষণিক ও চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এরই মধ্য দিয়ে আধুনিক বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেলের জোগান সংকট দেখা দিয়েছে, যা বিশ্বকে গত সাড়ে চার মাস ধরে সামাল দিতে হচ্ছে।
তেহরানের জন্য এই প্রণালিটি সবচেয়ে শক্তিশালী তাস, যা একই সঙ্গে তাদের নিজেদের জন্যও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে মাইন পুঁতে রেখেছে; জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং এই পথ দিয়ে যান চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ফাতিহ বিরল একে ‘বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জোগান বিপর্যয়’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
এই শক্তি বা লিভারেজ বাস্তবসম্মত। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সাধারণত হরমুজ দিয়ে সরবরাহ হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো পাইপলাইনই হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি কাজ করতে পারবে না।
কিন্তু ইরান অন্য সবার সঙ্গে নিজের জীবনরেখাও টেনে ধরছে। এক সময় আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি তিন ডলার কমে বিক্রি হওয়া ইরানি অপরিশোধিত তেল এখন ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারিতে মে মাসে দেশটির তেল রপ্তানি ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে এসেছে, যা তাদের নিষিদ্ধ নৌবহরকেও কোণঠাসা করে ফেলেছে।
এমনকি যুদ্ধের আগেও বিশ্বব্যাংক আভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি সংকুচিত হবে। এই প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে তেল বিক্রির ধসের নেতিবাচক প্রভাব হবে বেশ সুদূরপ্রসারী। ২২ জুন মার্কিন ট্রেজারি ৬০ দিনের একটি ছাড়পত্র জারি করেছিল, যা ইরানকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ণ বাজারমূল্যে তেল বিক্রির অনুমতি দেয়। কিন্তু মঙ্গলবারের হামলার পর তা বাতিল করা হয়েছে।
এটিই হচ্ছে ইরানের এই প্রণালির ওপর যৌথ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং চলাচলকারী জাহাজের ওপর এক ধরনের ‘সার্ভিস চার্জ’ বা টোল ব্যবস্থা চালুর জেদ ধরার অর্থনৈতিক পটভূমি। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সমুদ্র আইনের অধীন ট্রানজিট পাসের অধিকার অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরান কোনো টোল আদায় করতে পারে না।
তেহরানের কাছে এই বিরোধটি টোল-সংক্রান্ত রাজস্বের ব্যাপার নয়, যা তাদের তেলের আয়ের তুলনায় খুবই সামান্য। এটি মূলত একটি কৌশলগত জলপথের ওপর নিজেদের নজির এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার লড়াই, যা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জিম্মি সম্পদ মুক্ত করার আলোচনার টেবিলে তাদের একমাত্র বাস্তব দর-কষাকষির হাতিয়ার।
সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টিও বেশ বিতর্কিত। ইরান তাদের আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদের অর্ধেক অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়ার দাবি তুলছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করছে। অন্যদিকে, সমঝোতা স্মারকে প্রস্তাবিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পৃথক পুনর্গঠন তহবিল ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালির এই সংকট মানে হচ্ছে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার বিকল্প খোঁজা। সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তাদের প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৬ মাইল) দীর্ঘ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পাঠাচ্ছে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমান উপসাগরে হাবশান-থেকে-ফুজিরাহ লাইনের ওপর নির্ভর করছে।
তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কা মূলত জ্বালানি পাম্পেই টের পাওয়া যায়। কিন্তু সারের ঘাটতির প্রভাব আগামী বছরের ফসল পর্যন্ত থাকে। এর মানে হলো, হরমুজ অচলাবস্থার সমাধান না হলে কেবল তেলের দামের চেয়ে আরও ধীরগতির এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনবে।
এই সমীকরণই এখন দুপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা ফয়সালা না করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চুক্তি করলে একই অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এই অমীমাংসিত বিষয় থেকে এটি বন্ধ হয়েছিল।
আবদুল্লাহ বান্দার আল-ইতাইবি: কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স কলেজের আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক; আলজাজিরা থেকে
সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- হরমুজ প্রণালি