ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

রাইট টার্ন

বড় ঋণের তথ্য আমানতকারীর জানার অধিকার

বড় ঋণের তথ্য আমানতকারীর জানার অধিকার
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ১৩:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিটি গ্রুপে দেশি-বিদেশি ৪৭ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা; যার মধ্যে খেলাপি ঋণও রয়েছে। কয়েক বছর ধরে ব্যাংকিং খাত নিয়ে প্রায়ই এমন খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এদিকে আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক অবসানের মুখে পড়লে বা বন্ধ হলে একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষিত আমানত পাবেন। তার আরও বেশি আমানত থাকলে সেই অর্থের দাবি অবসায়কের কাছে করতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংক দুর্বল হলে সুরক্ষা সীমার বাইরের টাকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সম্পদ উদ্ধার ও অবসায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।

ধরা যাক, এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সারাজীবনের সঞ্চয় মিলিয়ে একটি ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকা রেখেছেন। ব্যাংক কাকে ৫০০ কোটি বা পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিল, সে সিদ্ধান্তে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু ব্যাংক দেউলিয়া বা বন্ধ হলে তিনি নিশ্চিত সুরক্ষা বাবদ দুই লাখ টাকা পাবেন। বাকি টাকা আদায় অনিশ্চিত। এই বাস্তবতাই বড় ঋণে স্বচ্ছতার প্রশ্নকে জনস্বার্থের প্রশ্নে পরিণত করে। মনে রাখা জরুরি, ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ এক দিনে তৈরি হয় না। আবার একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে একটি ব্যাংক হয়তো নিজের অংশের ঝুঁকি দেখে; কিন্তু একই গোষ্ঠীর নেওয়া ঋণের সম্মিলিত ঝুঁকি অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের সামনে আসে না। অথচ আমানতকারীর অর্থই এই ঋণের বড় উৎস। এ কারণেই বড় ঋণের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার। 

কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক গোপন তথ্য বা জনসাধারণের ব্যক্তিগত ঋণের তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন নেই। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যাংক ঋণ হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে গেলে জনগণকে জানানো দরকার– সব ব্যাংক মিলিয়ে কোম্পানি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মোট ঋণ কত; ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে কিনা; কতবার ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে; প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত মানুষ কাজ করেন; উৎপাদন চালু আছে কিনা। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক বড় কোনো ঝুঁকি দেখতে পাচ্ছে কিনা। এই ব্যবস্থার নাম হতে পারে ‘বড় ঋণে স্বচ্ছতা ও আগাম সতর্কতা কাঠামো’। 

ভুলে গেলে চলবে না, বড় কোম্পানি বন্ধ হলে মালিক একা ডোবেন না। কর্মী, সরবরাহকারী, পরিবেশক, দোকানদার, পরিবহন শ্রমিকসহ অনেক স্তরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই যে কোম্পানি জনগণের আমানত থেকে হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেবে, সেই কোম্পানির ‘শ্রমিক-কর্মচারী সুরক্ষা পরিকল্পনা’ থাকা উচিত। কোম্পানি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়লে কর্মীদের বেতন, চাকরি ও আইনগত পাওনা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে– তা এই পরিকল্পনায় আগে থেকেই নির্ধারিত থাকবে।

আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো, ঋণ পুরোপুরি খারাপ হওয়ার পর আলোচনা শুরু হয়। অথচ তার আগেই সংকেত থাকে। কারখানার উৎপাদন কমে, কিস্তি অনিয়মিত হয়, পুনঃতপশিল বাড়ে, কাঁচামাল আমদানি কমে, বেতন দিতে দেরিসহ নানান ঘটনা ঘটে। তাই বড় ঋণের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় কোনো শিল্পগোষ্ঠীর সম্মিলিত ঋণ নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে তার আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি থাকতে পারে ‘বড় ঋণ গ্রহীতা জবাবদিহি পর্যালোচনা ব্যবস্থা’। নির্দিষ্ট সময় পরপর ঋণদাতা ব্যাংকগুলো, বাংলাদেশ ব্যাংক, ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন নিরীক্ষক এবং প্রয়োজন হলে শ্রমিক-কর্মচারীর প্রতিনিধি একসঙ্গে বসবেন। সেই সব তথ্য আমানতকারীদেরও জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে: প্রতিষ্ঠানটি কি স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালাতে পারছে? ঋণ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা আছে কি? সমস্যা সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি? নতুন ঋণের টাকা কি উৎপাদনে যাচ্ছে? নাকি পুরোনো ঋণের দায় মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে? কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা আছে কি? কর্মীদের চাকরি ও বেতন ঝুঁকিতে কি? এখনই ব্যবস্থা নিলে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো সম্ভব কি?

এই ধরনের ব্যবস্থা রাখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যবসায়ীকে অপমান বা ব্যবসা বন্ধ করা নয়। উদ্দেশ্য হলো সমস্যা আগেভাগে চিহ্নিত করা, ব্যাংকের টাকা ফেরত পাওয়া, হাজার হাজার কর্মীর চাকরি বাঁচানো, জনগণের আমানত রক্ষা এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সময়মতো সহায়তা করা।

এর সঙ্গে ব্যাংকের জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকা দরকার। ব্যাংক কি ঋণ দেওয়ার আগে ব্যবসার সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করেছিল? একই গোষ্ঠীর মোট ঋণ বিবেচনায় নিয়েছিল? জামানত যথেষ্ট ছিল? ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা, তা দেখেছে? সমস্যা জানার পরও নতুন ঋণ দিয়েছে কিনা? কারণ ঋণের টাকা ব্যাংক পরিচালকদের ব্যক্তিগত টাকা নয়। এর বড় অংশ সাধারণ মানুষের আমানত।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্বাসের ওপর চলে। আমি ব্যাংকে টাকা রাখি; কারণ বিশ্বাস করি, প্রয়োজনের সময় ফেরত পাব। ব্যাংক উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয়; কারণ বিশ্বাস করে, তিনি ব্যবসা করে টাকা ফেরত দেবেন। কিন্তু বিশ্বাস অন্ধকারে টেকে না। তা টেকে স্বচ্ছতায়। বিশ্বাসের শক্তিশালী ভিত্তি হলো তথ্য ও জবাবদিহি। তাই জনগণের আমানত থেকে দেওয়া বড় ঋণ নির্দিষ্ট সীমার পর আর শুধু ব্যাংক ও ঋণ গ্রহীতার ব্যক্তিগত বিষয় থাকতে পারে না। যেখানে জনস্বার্থ আছে, সেখানে জনগণের জানার অধিকারও থাকতে হবে। আর্থিক খাত ধ্বংস বা মানুষ আর্থিক খাতের ওপর থেকে আস্থা হারালে দিন শেষে তা দেশ ও দেশের মানুষের বড় ক্ষতি।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×