ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সমাজ

জলাবদ্ধতা, নদী এবং নাগরিক দায়িত্ব

জলাবদ্ধতা, নদী এবং নাগরিক দায়িত্ব
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩১ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

এখন বর্ষাকাল। জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে অবিরাম বৃষ্টি আর হচ্ছে না। থেকে থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে নানা অঘটন ঘটে যাচ্ছে। পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে প্রাণহানিও ঘটছে। আর চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা তো সর্বনাশা হয়ে উঠেছে। 

বর্ষাকালে নদী-নালা নাব্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সেটা কোথাও আশীর্বাদ আর কোথাও অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। বর্ষাকালের আগে-পরে নদীভাঙনের শিকার মানুষ আশ্রয় খোঁজে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। অবশেষে শহরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। 

বিশ্বের অনেক দেশেই নদী একদা ‘জনপদের দুঃখ’ বলে অভিহিত হতো। আমরা শৈশব থেকেই হোয়াংহো নদীকে ‘চীনের দুঃখ’ হিসেবে জানতাম। কিন্তু এখন সেই হোয়াংহো দেশটির বড় সম্পদ হিসেবে পরিচিত। নেদারল্যান্ডসের শহর আমস্টারডামে রয়েছে অসংখ্য খাল, যেগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচুতে থেকেও কী চমৎকার প্রযুক্তি কৌশলে পানির সঙ্গে তারা সহাবস্থান করছে।

আমাদের এই দেশেও ভুল প্রযুক্তি নিয়ে ‘নদী শাসন’ শুরু হয়েছিল। যে কারণে পাকিস্তান আমলে সৃষ্ট ওয়াপদাকে শ্বেতহস্তী বলা হতো। সেই শ্বেতহস্তী নদী শাসনের নামে যত অর্থই দেওয়া হোক, তা হজম করে ফেলত। সেই ভুল প্রযুক্তি অদ্যাবধি চালু আছে। নদী আপন বেগে পাগলপারা। নদীকে বাধা দিলে সে তা মানে না; ভিন্ন পথ তৈরি করে। কখনও কখনও অভিমানে নিজেকে শুকিয়ে মারে।

আমাদের জাতিগতভাবে ঐতিহ্য ধ্বংস করার প্রবণতা বিদ্যমান। ঐতিহাসিকভবেই বাংলাদেশে নৌপথ ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। মোগল আমলেও দেখা যায়, দিল্লি থেকে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকায় হাতি-ঘোড়া এবং সেনাবাহিনী নিয়ে স্থল ও নদীপথে যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নৌপথ ছাড়া অন্য কোনো পরিবহন ব্যবস্থা ছিল না। সেনাপতি ইসলাম খাঁ রণতরী নিয়ে সারাদেশ শাসন করতেন। নদীতীরে তখন বড় বড় শহর এবং ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নৌপরিবহন ও রেলপথের প্রতি প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তীকালে তা শুধু অটোমবিলনির্ভর হয়ে পড়ে। মোটরগাড়ি প্রধান পরিবহনের জায়গা দখল করে। কিন্তু বড় বড় নদীতে নৌপরিবহনই প্রধান ব্যবস্থা হিসেবে চলতে থাকে। ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল-খুলনা এসব পথে নৌপরিবহনের কোনো বিকল্প ছিল না। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে নৌপরিবহন দ্বিতীয় ব্যবস্থা হিসেবে চালু ছিল। এ ছাড়াও যেসব নদীতে ন্যূনতম নাব্য ছিল, সেখানেও বড় বড় নৌকা ও লঞ্চ যাতায়াত করত। সেই সঙ্গে নৌকায় শ্যালো ইঞ্জিন ব্যবহার করে তাকে একটা যান্ত্রিক রূপ দিয়ে নদীপথকে আরও সচল করে দেয়।
ইতোমধ্যে অটোমোবিলের পথ প্রশস্ত হতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নদীপথে নৌপরিবহনের যে ব্যাপক সুবিধা সৃষ্টি হয়েছিল, তা সংকুচিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় নৌযানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ঢাকা থেকে বরিশাল-খুলনার যে নৌপথ ছিল, তা এখন একেবারেই রুদ্ধ হওয়ার পথে। 

আমি অনেকবার লিখেছি ও আক্ষেপ করেছি। দেশে দূরদর্শী কোনো পরিকল্পক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেননি। রাজনৈতিক সমস্যা তো আছেই, নিজ দলের বাইরে কাউকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার দায়িত্বে নিয়োজিত করার ঐতিহ্য আমাদের নেই। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন করা হয়েছিল। কিন্তু আমলাদের আগ্রাসনের মুখে তা একটা পর্যায়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় কোনো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞের কাজ করার সুযোগ নেই। পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। আমাদের দেশে আমলারাই এসব ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। 
কতটুকু রেলপথ, কতটুকু নৌপথ, কতটুকু মোটরপথ এবং কতটা অন্যান্য যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট করা হবে, তার একটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করা যেতে পারত। তা হয়নি; সবটাই হয়েছে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট তত্ত্বে। ফলে অবকাঠামো নির্মাণে বারবার হোঁচট খেয়ে অনেক বিলম্বে কিছু মেগা প্রজেক্ট নিতে হয়েছে। মেগা প্রজেক্টগুলো ব্যয়বহুল হয়েও যেহেতু বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভর, তাই তা জনবান্ধব হয়েছে।

নৌপরিবহনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নদী সংকুচিত হয়ে আসছে। একদিকে উজানের দেশে নির্মিত বাঁধগুলো, অন্যদিকে ব্যাপক দখল। নদী দখলের একটা মহোৎসব শুরু হয়েছে এই দেশে। নদীর জায়গা প্রভাবশালী লোকেরা নিজেদের বলে মনে করে এবং সেই চিন্তা থেকে নদীর জায়গাতেই অবলীলায় বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলে। মাঝেমধ্যে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চলে; কিন্তু কয়দিন পরই অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। সুবিধাভোগী দখলদাররা তাদের পক্ষে সরকার ও পেশিশক্তিকে আনতে সমর্থ হয়।

শুধু যে নদী, তাই নয়। দেশের জলাধারগুলোর একই অবস্থা। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ চলনবিল। উত্তরবঙ্গের ফুসফুস নামে পরিচিত বিলটি কালক্রমে ধ্বংসই হয়ে গেছে। এমনই অনেক বিল, হাওর ও বড় বড় জলাশয় ধ্বংস হয়ে জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছে।

যে কোনো দেশেই জলাধার রক্ষার জন্য কঠোর আইন রয়েছে। আমাদের দেশে আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় না। জলাধার কৃষির জন্য এক অপরিহার্য সম্পদ। জলাধারগুলোকে রক্ষা না করে সেচের জন্য হুট করেই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা করা হলো, যার পেছনে থাকল নানা বিদেশি সংস্থা। এ ধরনের ব্যবস্থার ফলে কৃত্রিম সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে পড়ে। বিদেশি প্রেসক্রিপশনে কিছু দেশ এতে প্রভূত উপকৃত হয়। কৃষিতে ফলন বাড়লেও সুদূরপ্রসারী ধ্বংসযজ্ঞ এর মধ্য দিয়েই সূচিত হলো। এসব কথা দেশের কিছু চিন্তাবিদও বহু বছর ধরে বলে আসছেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

দেশে একটি নদী কমিশন আছে। একসময় এই কমিশনের কথা শোনা যেত বেশ উচ্চকণ্ঠে। এখন সেই কণ্ঠস্বর স্তিমিত। বস্তুত নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়েই সম্মিলিত কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। অথচ বিষয়টি কত গুরুত্বপূর্ণ, তা দেশের শিক্ষিত জনগণও বুঝতে পারছে না। দেশে পরিবেশ আন্দোলন আছে। তাতেও জনসাধারণের অংশগ্রহণ খুব সামান্য। এই অংশগ্রহণ ব্যাপক হওয়া প্রয়োজন। 
ঢাকা ও চট্টগ্রামে যে ঘন ঘন জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে, এর মূলে রয়েছে নিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতি ও অবনতি। এ দুই মহানগরীর নদী ও খালগুলোর প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা যদি সচল থাকত, তাহলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দিত না। একই কথা বলা চলে বাংলাদেশের অন্যান্য শহর ও নগরীর ক্ষেত্রে। জলাবদ্ধতা সম্প্রসারিত হচ্ছে সেখানেও।

নদীকে আসলে নদীর মতো রাখতে হবে বা থাকতে দিতে হবে। নদী শুকিয়ে গেলে মানুষও শুকিয়ে যাবে। বাংলার কালজয়ী শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, চারুকলা– সবকিছুই বালুচরে ঢাকা পড়ে যাবে। এই অমোঘ সত্যটি যতদিন আমাদের রাজনীতিবিদ, সচেতন নাগরিক ও প্রযুক্তিবিদরা না বুঝবেন, ততদিন পর্যন্ত নদীগুলো হাহাকার করতে থাকবে।

আমাদের নিসর্গ তৈরি হয় নদী দিয়ে। আমাদের পদ্মার ঢেউ কালজয়ী গানের জন্ম দেয়। কত মানুষের স্বপ্নের আধার এই নদী। লাখ লাখ মৎস্যজীবীর জীবিকার সংস্থান এই নদী। রূপসী, অভিমানী নারীর মতো নদী আমাদের ডাকে। নিয়ে যায় শান্তির দূরদেশে। ক্ষতবিক্ষত নদী আমরা দেখতে চাই না। দেখতে চাই ফসলের সমারোহে স্বপ্নের দিগন্তে আমাদের স্বপ্নের নদী।

মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×