ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

স্টেশনের বুবি কি আমাদের কেউ ছিলেন?

স্টেশনের বুবি কি আমাদের কেউ ছিলেন?
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গরিব মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু নতুন ঘটনা নয়। বাসচাপা; নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়া ইটের আঘাত; সড়কে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে তাদের মৃত্যু হয়। কারখানার আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়। কখনও তাদের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হয়। আর ছিন্নমূল মানুষের মৃত্যুর খবর কোনো আলোচনার বিষয়ই নয়। তারা বেওয়ারিশ হয়ে যায়। গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, ২০২৫ সালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মোট ৬৪৩টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন ও দাহ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের বৃদ্ধা বুবি বেগম ওরফে বুবি যথেষ্ট সম্মান নিয়েই শেষ বিদায় নিলেন। এই পৃথিবীর আত্মীয়হীনা এই বৃদ্ধাকে তবুও চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে তাঁকে সহায়তা দিয়ে ছবি তুলেছিলেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। যদিও বুবি বেগমের তখন আর কোনো সহায়তা গ্রহণের অবস্থা নেই। চোখে-মুখে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন নিয়ে একটি সবুজ রঙের প্লাস্টিকের চেয়ারে তিনি বসে ছিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সহায়তা প্রদানকারী কর্মকর্তাসহ উপস্থিত সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। 

৮ জুলাই বুবি বেগমের নামাজে জানাজা আর দাফনে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। সাময়িক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মৃত্যুর খবর অনেকভাবেই গুরুত্ব পেল। এর সামান্য গুরুত্ব যদি জীবদ্দশায় তিনি পেতেন এবং রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে পারত তাহলে আরও অনেক গৃহহীনের জীবন সহনশীল হতো। ৭০ বছরের একজন নিঃসঙ্গ বাকপ্রতিবন্ধী দোকানের সামনে ঝাড়ু দিয়ে আয় করেন। দুর্বৃত্তরা তাঁর সারাজীবন ধরে জমানো মোটে কয়েক হাজার টাকা ছিনতাই করে নিতে ভয়ানক আঘাত করে। এই ব্যথা অনুভবের দায় কার? দেশের গৃহহীন, ছিন্নমূল মানুষদের নিয়ে ভাবনার দায় কি রাষ্ট্রের নয়? এই রাষ্ট্র গরিবের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।  

২০১৮ সালে সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ জানিয়েছিলেন, দেশে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা দুই লাখ ৮০ হাজার ৬৩৪। আর ভূমিহীনের সংখ্যা বলেছিলেন ১০ লাখ ৬৯ হাজার ২৬৪।  জনশুমারি ও গৃহ গণনা-২০২২ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ২২ হাজার ১৮৫ জন ছিন্নমূল বা গৃহহীন মানুষ রয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার তথ্যমতে, শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৫০ হাজার ছিন্নমূল মানুষের বসবাস। এই সংখ্যা নিয়ে তাই বিভ্রান্তি রয়েছে। কিন্তু সংখ্যা যা-ই হোক, ছিন্নমূল মানুষও একটি দেশের নাগরিক। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব মানুষের জীবনের কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা নিরাপত্তা নেই। কোনো সরকারই ছিন্নমূল মানুষদের নিয়ে চিন্তা করে না। কারণ ছিন্নমূল মানুষেরা গদি টিকিয়ে রাখে না। বড়জোর তারা ৫০ বা ২০০ টাকায় মিছিলে মাথা গুনতি সংখ্যা হয়। অথচ সংবিধান বলে– দেশের সব মানুষের মৌলিক চাহিদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাকপ্রতিবন্ধী বুবির আঘাত পাওয়া মুখচ্ছবি ছড়িয়ে গেছে সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু এমন একজন অসহায় মানুষকে আঘাত করতে যাদের এতটুকু বুক কাঁপেনি, সেই দুর্বৃত্তদের ধরতে কোন তৎপরতা আছে প্রশাসনের? ৪ জুলাইয়ের ঘটনার পর রেলস্টেশনের বুবি আরও অসুস্থ হলেন, মারাও গেলেন। জানান দিয়ে তাঁর জানাজা, দাফনও হলো। অথচ এ ঘটনায় সিসি ক্যামেরা দেখে কাউকে আটক করা হয়নি ৯ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত। 

প্রায় ২৫ বছর আগে ট্রেনে চড়ে মেথিকান্দা স্টেশনে এসেছিলেন বুবি। আর কোথাও ফিরে যাননি। স্টেশনে পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। বিনিময়ে দোকানদারদের কাছ থেকে টাকা নিতেন। মাঝে মাঝে ভিক্ষাও করতেন। অল্প অল্প করে ৩০ অথবা ৪০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। সেই টাকা দুর্বৃত্তদের না দেওয়ায় তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হলো। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে বলে জানালেন সমকালের নরসিংদী প্রতিবেদক। এ যে নামকাওয়াস্তে নিয়ম মেনে মামলা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৃদ্ধা বুবি বেগম ওরফে বুবির মামলার সুবাদে আরেকটি মামলার কথা মনে পড়ল। 

২০০৫ সালে রাজধানীর শাহজাহানপুরে এক ব্যক্তির ব্যাগ থেকে উদ্ধার হয়েছিল এক শিশুর কাটা মাথা। সেই ব্যক্তিকে নিয়ে ভাওয়ালের শালবনে গিয়ে একটি কঙ্কাল উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এ ঘটনায় ২০০৫ সালে শাহজাহানপুর থানায় মামলা হয়। অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির ফাঁসির আদেশ হয় ২০১৬ সালে। তবে ২০২২ সালে অভিযুক্ত দুজন নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং তারা মুক্তি পান। আর ব্যাগের ভেতর কাটা মাথা কোন শিশুর ছিল, সে পরিচয় জানা যায়নি। এ ঘটনায় দুটো প্রসঙ্গ উঠে আসে– নির্দোষ দুই ব্যক্তি দেড় যুগ ধরে কারাগারে থাকায় বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা; খুন হওয়া শিশুর পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রের উদাসীনতা। কেননা, শিশুটি কারও কেউ হয় না। কিন্তু কারও কিছু না হওয়া মানুষ তো রাষ্ট্রের পরমাত্মীয় হওয়ার কথা। দেশের ছিন্নমূল ও গৃহহীন মানুষের মৃত্যুকে আমরা শুধু সংবাদ হিসেবে দেখি; সামাজিক ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়।

দেশের সব শ্রেণির মানুষের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে ছিন্নমূল ও গৃহহীন মানুষদের পুনর্বাসন, আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনতে হবে। আমরা নিরাপত্তা বলতেই শুধু সামরিক বা প্রশাসনিক নজরদারি বুঝি। খাদ্য, পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতির মতো প্রসঙ্গ যতদিন অসামরিক নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না হবে, ততদিন এ দেশে ছিন্নমূল, গৃহহীন মানুষের মানবিক নিরাপত্তা তৈরি হবে না। বুবির জন্য কোনো শোকসভা হবে না; তাঁর হত্যার বিচার চেয়ে আমরা কেউ মিছিল করব না। বুবির কেউ নেই। কিন্তু বুবি এই সমাজের মানুষ ছিলেন– এ কথা তো সত্যি। সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষটি শান্তিতে ঘুমাতে না পারলে কোনো উদ্যোগই সার্থক নয়।

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: 
সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×