বিশ্বকাপ লইয়া সংঘর্ষ
খেলাকে খেলার জায়গায় রাখিতে হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের সূচনা হইতেই বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যকার বিরোধ, সংঘর্ষ ও সংঘাতের খবর শোনা যাইতেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাত্রিতে আর্জেন্টিনা-মিসরের মধ্যকার খেলা লইয়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের অপ্রীতিকর অঘটন ঘটিয়াছে। কুমিল্লায় খেলা লইয়া বচসা এবং উহার পরিপ্রেক্ষিতে সংঘর্ষে এক যুবক প্রাণ হারাইয়াছেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলা দেখিতে আসন গ্রহণকে কেন্দ্র করিয়া কয়েকবার সংঘর্ষ হইয়াছে। ঝিনাইদহে এক পক্ষের হামলায় যুবক আহত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছেন। এই সকল খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বস্তুত খেলার প্রতি ভালোবাসা এহেন সহিংসতার রূপ পরিগ্রহ করিলে তাহা সামাজিক অসহিষ্ণুতারই প্রতিনিধিত্ব করিয়া থাকে।
ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক ক্রীড়ার আসর। চার বৎসর অন্তর আয়োজিত এই টুর্নামেন্ট ঘিরিয়া বাংলাদেশের মানুষের উত্তেজনা বিস্ময়কর। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করিলেও এই দেশের মানুষ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দলের সমর্থকরূপে বিশ্বকাপকে স্বীয় উৎসবে পরিণত করিয়াছে। পতাকা টানানো, জার্সি পরা, দলবদ্ধ হইয়া খেলা পর্যবেক্ষণ, জয় উদযাপনের দৃশ্য আনন্দময়। কিন্তু মারামারি, সংঘর্ষ, এমনকি প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক। নিছক এই খেলা লইয়া আত্মহত্যার ঘটনা আরও ভয়াবহ বার্তা দিয়া থাকে।
আমরা দেখিতে পাইতেছি, বিশ্বকাপ চলাকালে সামাজিক মাধ্যমে কটূক্তি, বিদ্রুপ, উস্কানিমূলক মন্তব্যের প্রতিযোগিতা চলিতে থাকে। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে উগ্র ফুটবল সমর্থকদের কারণে স্টেডিয়ামের বাহিরে ও সগকে সহিংসতা হইয়া থাকে। ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকিবে, ১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে আত্মঘাতী গোল করিয়াছিলেন কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। দেশে প্রত্যাবর্তনের মাত্র ১০ দিন পরই নাইট ক্লাবের বাহিরে মাদক চক্র ও জুয়াড়িদের রোষানলে পড়িয়া তাঁহাকে প্রাণ দিতে হইয়াছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনা ফুটবল ইতিহাসের একটা কলঙ্কজনক অধ্যায়রূপে চিহ্নিত। এখন দেখা যাইতেছে, না খেলিয়াও বাংলাদেশের সমর্থক কেহ কেহ তদ্রূপ পরিস্থিতি তৈয়ার করিতেছেন।
এই সকল ঘটনা সুস্থ সমাজের লক্ষণ হইতে পারে না। বিদেশি দলের জয়-পরাজয়ে বাংলাদেশে কেন সহিংসতা হইবে? খেলাধুলার উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ প্রদান; সংঘাতের বিস্তার নহে। ক্রীড়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতাই সৌন্দর্য। প্রযুক্তিনির্ভরতা ও সামাজিক মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও উস্কাইয়া দিয়া থাকে; যেইখানে অনলাইনে বিদ্রুপ, ট্রল ও অপমানজনক মন্তব্য বাস্তব জীবনেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈয়ার করে।
তরুণদের একটি অংশ যেইভাবে আন্তর্জালের প্রতিযোগিতাকে বাস্তব সংঘর্ষে পরিণত করিয়া ফেলিতেছে, উহা ভয়ানক ইঙ্গিত। প্রিয় দল হারিলে হতাশা থাকিতে পারে কিংবা জয়লাভে আনন্দ হইবে। কিন্তু সেই আবেগ কখনোই অন্যের প্রতি বিদ্বেষ বা সহিংসতার কারণ হইতে পারে না। এই জন্য বিদ্যালয়ে ক্রীড়ার চেতনা ও সামাজিক সংহতির মূল্যবোধ আরও বেশি গুরুত্বের সহিত তুলিয়া ধরিতে হইবে।
ক্রীড়া নির্মল আনন্দ দেয় এবং বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আয়োজনরূপে ইহার পৃথক গুরুত্ব নিশ্চয়ই রহিয়াছে। সেই তাৎপর্য অনুধাবন করিতে হইবে ইতিবাচক উদযাপনের মাধ্যমে। সংবাদমাধ্যমের কর্মী ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হইতে হইবে। দর্শকদের প্ররোচিত করিবার জন্য উস্কানিমূলক প্রচার, বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট বা অযথা উত্তেজনা তৈরিকারক উপাদান হইতে বিরত থাকিতে হইবে। ইহার সহিত যেইখানে সংঘাতের আশঙ্কা রহিয়াছে, সেইখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তৎপর থাকিতে হইবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরিয়া বাংলাদেশিদের মাতামাতি বিশ্বে এখন আলোচিত বিষয়। ইহা ইতিবাচকরূপে জনসমক্ষে আসিলে নিঃসন্দেহে দেশের সুনাম। কিন্তু নেতিবাচক খবর দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন উত্থাপন করে। তজ্জন্য সকলেরই দায়িত্বশীলতা কাম্য। ৯০ মিনিটে ফুটবল খেলা সমাপ্ত হইয়া যায়। কিন্তু ইহার যেই রেশ তাহা নেতিবাচক হইলে বহন করিতে হয় আজীবন। ইহা বিস্মৃত হইলে চলিবে না– শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শুধু খেলাই। কিন্তু মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতির মূল্য তাহার অধিক।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়