জন জীবন
সাইকেল মার্কায় বাজেট দিন
আইরিন সুলতানা
আইরিন সুলতানা
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
এন্ড্রু কিশোর ও আবিদা সুলতানার কণ্ঠে আশির দশকের জনপ্রিয় গান– ‘চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া’ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসে ধাক্কা খেয়েছে। ৩ জুন বিশ্ব সাইকেল দিবসে সবুজ বাহনকে স্বাগত জানিয়েছিল সবাই। তার কয়েক দিন পর ১১ জুন সংসদে বাজেট প্রস্তাবের পর জানা গেল, সিগারেট, গাড়ির সঙ্গে সাইকেলের দামও বাড়ছে। সিগারেট ফুসফুসের যম। কিন্তু সাইকেলে ফুসফুসে বাড়বে দম। কার্বন ফুটপ্রিন্ট বাড়ে গাড়ি চলাচলে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় চড়তে হবে সাইকেলে। সেই সাইকেলের দাম বেড়েছে বাজেটে!
ফ্রি হুইল আমদানিতে এবার ২৫ শতাংশ কাস্টমস বা আমদানি শুল্ক ও ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসেছে। ব্যস! তৎক্ষণাৎ দাম বাড়বে এমন পণ্য তালিকায় যুক্ত হলো সাইকেলের নাম। ফ্রি হুইল কী? ফ্রি হুইল সাইকেলের পেছনের চাকায় লাগানো একটি যন্ত্রাংশ। ফ্রি হুইল মেকানিজমের কারণে চলন্ত অবস্থায় সাইকেলের প্যাডেল না ঘোরালেও চাকা ঠিকই ঘুরতে থাকে। এমন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের আমদানিতে এত বড় অঙ্কের শুল্ক কেন বসানো হলো? কারণ হলো, আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় বাইসাইকেল শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা।
এবারই প্রথম শুল্ক বসেছে বাইসাইকেলে? ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ১৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয় ফ্রি হুইল ও স্প্রোকেট হুইলে। এর আগের অর্থবছরে তা ১০ শতাংশ ছিল। আগে অবশ্য ফ্রি হুইলের সঙ্গে স্প্রোকেট হুইলও শুল্কের আওতায় ছিল। এবারের বাজেটে স্প্রোকেট হুইল উহ্য দেখা গেছে। পুরো শুল্ক লাফিয়ে বসেছে ফ্রি হুইলের ঘাড়ে। কেন ১৫ থেকে লাফিয়ে ২৫ শতাংশ হলো শুল্ক?
বাংলাদেশ ট্রেন্ড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ওয়েবসাইটে ২০২২-২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাইসাইকেল ও রিকশার ফ্রি হুইল ও স্প্রোকেট উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিতে আবেদন করেছিল বাংলাদেশ বাইসাইকেল মার্চেন্ট অ্যাসেম্বলিং অ্যান্ড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। বিটিটিসি অনুসারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রি হুইল ও স্প্রোকেট শিশুশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। এর বিকাশে ফ্রি হুইল আমদানিতে ২৫ শতাংশ সুরক্ষামূলক শুল্ক বসানোর সুপারিশ করে রেখেছিল বিটিটিসি। ২০২৩ সালের পরামর্শটি ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে যুক্ত হলো।
দেশে ফ্রি হুইল উৎপাদন শিল্পের হালচাল কেমন? দু-তিন বছর পুরোনো ডেটা বলছে, দেশে ফ্রি হুইলের চাহিদা ৩৫-৪০ লাখ ইউনিট। আর স্প্রোকেট চাহিদা ৫০ থেকে ৫৫ লাখ ইউনিট। এই চাহিদা মেটাতে অন্তত তিনটি বড় সাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও বাজারজাত সক্ষমতা ছিল ২০২৩ সালের দিকেই। একটি প্রতিষ্ঠান ৩০ লাখ ইউনিট ফ্রি হুইল ও ৬০ লাখ ইউনিট স্প্রোকেট উৎপাদন শুরুও করে। তিনটি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি উৎপাদন শুরু ও ধরে রাখলে এক কোটি ইউনিট উৎপাদন, দেশীয় বাজার চাহিদা মেটানো এবং বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব।
ওদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২১ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৯ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৫ হাজার টন ফ্রি হুইল ও স্প্রোকেট আমদানি হয়েছে। এই বাড়-বাড়ন্ত আমদানি শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের আশঙ্কাও সৃষ্টি করে। ওই পরিস্থিতিতে আমদানি কমাতে শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করাকেই সমাধান মনে করা হয়।
২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলারের সাইকেল রপ্তানি করে সর্বোচ্চ আয়ের চমক জাগিয়েছিল। এখানকার বাইসাইকেলের বড় গন্তব্য ইউরোপ। বিদেশে এই দ্বিচক্রযানের কদর রয়েছে। জার্মানিতে জনসংখ্যা ও সাইকেল সংখ্যা নাকি সমান। সুইডেন-নরওয়ের অর্ধেকের বেশি সংখ্যক মানুষ সাইকেলে যাতায়াত করে।
এই শহরে যানবাহনের বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ শরীর-মনকে অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে। অথচ সপ্তাহে দুই থেকে চার ঘণ্টা সাইক্লিং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। শিশু বয়স থেকে সাইকেল চালালে উচ্চতাও ভালো হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন আর ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের প্রভাব আমরা ফুয়েল স্টেশনে গিয়ে টের পেয়েছি। জলবায়ু বিপর্যয় বা জ্বালানি ভোগান্তি কেবল নয়; শহরে দুর্বিষহ যানজটেরও অন্যতম কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি। এখন মধ্যবিত্তও নিজের গাড়ি ছাড়া নড়তে চাইছে না। পরিণামে যানজটে বসে বসে আয়ু ফুরাচ্ছে। আগে গ্রামে ঘরে ঘরে একটা সাইকেল তো থাকতই। বাজার-দোকান, স্কুল-কলেজ, দূরে বা পাশের গ্রামে যেতে উঠান-বারান্দা থেকে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত বাড়ির লোকেরা।
দেশের নাগরিক জীবনে সাইকেল পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে চুপ করে থাকলে হবে না। সময় থাকতেই দশ ফোঁড় দিতে হবে উপযুক্ত বাজেট বরাদ্দ দিয়ে। এক. বাজেটে আমদানি শুল্ক বাড়লেই দেশীয় সাইকেলের দাম বাড়বে– এই ধারণা ভাঙতে হবে। আমদানি-নির্ভরতা কমানো ও দেশীয় শিল্প বিকাশের যোগসূত্র সবাইকে জানাতে হবে। দুই. আমদানি কমিয়ে ফ্রি হুইল উৎপাদন বাড়াতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। তিন. দেশে বর্তমানে সাইকেল ব্যবহারকারী, তাদের বয়স শ্রেণি, আঞ্চলিক প্রবণতা নিয়ে জরিপ চালাতে হবে। চার. ‘গ্রাম থেকে শহরে, সাইকেল থাকুক প্রতি পরিবারে’– এমন প্রচারণা চালাতে হবে। পাঁচ. গ্রাম থেকে শহরে রাজনৈতিক শোডাউনে মোটরসাইকেলকে নিরুৎসাহিত ও বাইসাইকেলকে উৎসাহিত করতে হবে। ছয়. ছাত্রছাত্রীর জামা-জুতা-ব্যাগের সঙ্গে সাইকেলও সরকারিভাবে দেওয়া হোক। এতে ‘সাইকেল প্রজন্ম’ গড়ে উঠবে। সাত. সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় সাইকেল স্ট্যান্ডের জায়গা বাধ্যতামূলক এবং শহরে সাইকেল লেনের নকশা বাস্তবায়ন করতে হবে। আট. বছরে একবার জেলা, বিভাগ, জাতীয় পর্যায়ে সাইকেল টুর্নামেন্ট হোক। নয়. দেশীয় সাইকেল নির্মাতা বড় ব্র্যান্ডগুলোকে বিজ্ঞাপন প্রচার, বিভিন্ন আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দশ. পকেট খরচ ও পথের সময় বাঁচানো, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশের উপকারের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করে জিডিপিতে সাইকেলের অবদান যুক্ত করতে হবে।
আমরা আজম খানের গানের মতো ‘চানখাঁরপুলে প্যাডেল মেরে’ বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেখতে চাই, এই সরকার সাইকেল শিল্পের সামাজিক, পরিবেশ-জলবায়ুগত এবং অর্থনৈতিক মূল্য প্রতিষ্ঠায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েছে।
আইরিন সুলতানা: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- আইরিন সুলতানা