ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

তৃতীয় মেরু

বন্যায় মানুষের বিপদ কিংবা পানির বিপাক

বন্যায় মানুষের বিপদ কিংবা পানির বিপাক
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক বন্যা বা জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে বিপন্ন করে তুলছে ঠিকই; বিস্মিত করেছে সম্ভবত তার চেয়েও বেশি। সন্দেহ নেই, গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, সেটা অস্বাভাবিক। গত রোববার থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ১১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অথচ ওই জেলায় জুলাই মাসে ৩০ বছরের গড় বৃষ্টিপাত ৮১১ মিলিমিটার (মোস্তফা কামাল পলাশ, প্রথম আলো, ১০ জুলাই ২০২৬)। 

তার মানে, জুলাইজুড়ে গড়ে যে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা; মাসের প্রথম সপ্তাহেই তার চেয়ে বেশি বর্ষণ ঘটেছে! প্রবল বর্ষণে পাহাড়ি অঞ্চলে ঢল অস্বাভাবিক নয়। সেটার তীব্রতাও কখনও কখনও স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই বলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা!

চট্টগ্রাম কেবল পাহাড়ি অঞ্চল নয়; জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে নদী, খাল ও ছড়ার প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা। আর উদার বক্ষ মেলে পাশে আছে বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিকভাবে পাহাড় বা নিষ্কাশনী নদী বা সমুদ্রের কোনো একটি থাকলেই বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকার কথা নয়। 

প্রশ্ন হচ্ছে, তিন তিনটি প্রাকৃতিক সুবিধা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণ কী? কেবল এই বছর নয়; ২০২৩ সাল থেকে গত তিন বছর ধরেই বর্ষাকালে ওই অঞ্চলে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষত বান্দরবানের মতো খাড়া পাহাড়ি অঞ্চলেও যখন বন্যা বা জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, তখন এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই– এর কারণ মনুষ্যসৃষ্ট।

আবহমান কাল থেকেই শুকনো মৌসুমে তিরতির করে বয়ে চলা পাহাড়ি নদী ও ছড়াগুলো বর্ষাকালে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পুলিশ কর্মকর্তা পিতার চাকরিসূত্রে কৈশোরে বান্দরবান ছিলেন। ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘নিশিদাদার সঙ্গে ছাতা মাথায় আমি রওনা হলাম। নদীর তীরে এসে মুখ শুকিয়ে গেল। বর্ষার পানিতে শঙ্খ নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তীব্র স্রোত। বড় বড় গাছের গুঁড়ি ভেসে আসছে। এই শঙ্খ নদী আগের ছোট্ট পাহাড়ি নদী না, এই নদী মূর্তিমতি রাক্ষসী।’

কেবল শঙ্খ নয়; মুহুরী, ফেনী, কর্ণফুলী, মাতামুহুরী, মেইনি, চেঙ্গি, ডলু, বাঁকখালী, নাফ– বৃহত্তর চট্টগ্রামের সব নদনদীই বর্ষায় ভয়ংকর হয়ে ওঠে। নদী তো বটেই; ছোট খাল ও পাহাড়ি ছড়াগুলোও বর্ষাকালে আক্ষরিক অর্থেই বিদ্যুৎ বেগে বয়ে চলে।

কর্ণফুলী অববাহিকার মানুষ বর্ষাকালে নদী, খাল ও ছড়ার রূদ্র রূপের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা অববাহিকার মানুষের মতো বন্যায় অভ্যস্ত নয়। উত্তরবঙ্গের মানুষ যেমন বন্যায় ঘর ডুবে গেলে চালের ওপর নির্বিকার বসে চিড়া-মুড়ি খায়; কলাগাছের ভেলা বানিয়ে এবাড়ি-ওবাড়ি বেড়াতে যায়; চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের সেই অভিজ্ঞতা নেই। তারা কেবল বিপন্ন বোধ করছে না; জান-মাল নিয়ে সত্যিই বিপন্ন। কারণ উত্তরবঙ্গীয় বন্যার মতো এই পানি টিপটিপ করে বাড়ছে না; নদী-ছড়ার প্রবল স্রোত জনপদে ঢুকে মুহূর্তেই ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে।

২০২৩ সালে প্রথম যখন এ ধরনের বন্যা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেখা দিয়েছিল, তখনই এক নিবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম, এর প্রধান কারণ সম্ভবত নবনির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। কারণ এই বন্যায় স্থানীয় জনসাধারণ বলছিলেন, ১০৩ কিলোমিটার রেললাইনটি নির্মিত হওয়ার আগে ওই অঞ্চলের পহাড়ি ঢল নির্বিবাদে সাগরে নেমে যেতে কখনও অসুবিধা হয়নি (রেলপথ বোঝ ঢলপথ বোঝ না, সমকাল, ১১ আগস্ট ২০২৩)।

বুয়েট অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হকও তখন বলেছিলেন, ‘নিষ্কাশনের পথে রেলের স্থাপনা তৈরি হয়েছে। রেলপথও স্থলভাগ দিয়ে গেছে আড়াআড়িভাবে। এতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে’ (সমকাল, ১০ আগস্ট ২০২৩)।

যা হোক, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০টি নির্দেশনা দিয়েছেন। এ নিয়ে শুক্রবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন প্রধামন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এর ১০ নম্বরটি হলো: ‘টানা ভারী বর্ষণে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমাতে ৫ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেলপথের উচ্চতা বৃদ্ধির কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।’

প্রশ্ন হচ্ছে, রেলপথের উচ্চতা বৃদ্ধি মানে কী? সড়কের উচ্চতা বৃদ্ধি? তাতে পাহাড়ি ঢল সাগরে নেমে যাওয়ার কী সুবিধা হবে? এডিবি প্রকাশিত প্রকল্পটির নথি অনুযায়ী, ১০৩ দশমিক ৪৭৭ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেলপথে চারটি নদী– কর্ণফুলী, শঙ্খ, মাতামুহুরী, বাঁকখালীতে চারটি বড় সেতু, ৩৫টি মাঝারি সেতু ও ১৪৫টি কালভার্ট রয়েছে। 

২০২৩ সালে প্রকল্পটির পরিচালক বলেছিলেন, ওই অঞ্চলে ১০০ বছরের ‘বন্যার ইতিহাস’ বিবেচনায় সেতু ও কালভার্টের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে নকশা করা হয়েছে। তখনই প্রশ্ন তুলেছিলাম যে, নকশা করার সময় বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পার্থক্য কি বিবেচনায় রাখা হয়েছিল? এখন যদি ‘রেলপথের উচ্চতা’ বাড়ানো হয়, তাতে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না; ঢলের পানি আরও বেশি আটকে থাকবে। বরং চাপের কারণে আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।

মূল বিষয় হলো, পাহাড়ি ঢলের প্রাকৃতিক পথগুলো সংকুচিত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। কেবল রেলপথটির কারণে নয়; অভ্যন্তরীণভাবেও নদী, খাল, জলাভূমি দখল ও ভরাট করে পানির পথ সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। 

যেমন, এবারের বন্যায় খোদ পাউবো জানাচ্ছে, জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানির লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও খালে যেসব স্লুইসগেট নির্মিত হয়েছিল; বন্যা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সময় সেগুলো খোলা থাকার কথা। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা সেগুলো চিরতরে বন্ধ করে ‘মাছ চাষ’ করছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পলি পড়ে নিষ্কাশন ব্যবস্থাই নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যার সময়ও খোলা যাচ্ছে না বা খুলতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে পানি নামতে পারছে না (ডেইলি স্টার, ১১ জুলাই ২০২৬)। 

প্রয়াত মার্কিন লেখক টনি মরিসন মনে করতেন, বন্যা নদীর শৈশবের স্মৃতিকাতরতা মাত্র। আমরা যখন নদীর স্বাভাবিক পথ কেড়ে নিই তখন নদী দূরে সরে যায় বটে; স্মৃতিকাতরতায় বারবার ফিরে আসে বন্যা হয়ে। দখলদার দেখলে সেই বন্যা বিধ্বংসী হয়ে ওঠে।

এক অর্থে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যায় মানুষ তো বিপদে আছেই; খোদ পানিও বিপাকে পড়েছে। শত শত বছর ধরে মেঘ থেকে নেমে যেসব পথে পানি সাগরে গিয়ে মিলত, সেই পথ আটকে রেখেছে দখলদাররা। এখন বন্যাক্রান্ত মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধারের পাশাপাশি বিপাকে পড়া পানিকেও পথ দেখাতে হবে। অন্যথায়, বন্যা প্রতিবছর বিধ্বংসী হয়ে উঠতেই থাকবে।

২০২৪ সালের বর্ষাকালেও ওই অঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী বন্যার সময় লিখেছিলাম, ‘খোদ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলছে, তিন জেলা কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী এলাকায় নদী, খাল, জলাভূমি দখলদারের সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যদি নদনদী, খাল-বিল দখল করে থাকি, স্থাপনা তৈরি করি, তাহলে বন্যার পানি কি আকাশ দিয়ে উড়ে যাবে?’ (গোড়া কাটা নদীর আগায় বন্যার পানি, সমকাল, ২৫ আগস্ট ২০২৪)। গত দুই বছরেও পরিস্থিতি তথৈবচ; বক্তব্যও প্রাগুক্ত। 

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×