অন্যদৃষ্টি
শ্রুতিলেখক নীতিমালা সংকট
তালুকদার রিফাত পাশা
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সাধনার পরে পাবলিক পরীক্ষায় বসেন। শিক্ষার্থীদের চিন্তায় থাকে কী করে ভালো ফল করা যায়। আর পরিবারের সদস্যরা প্রার্থনা করেন সন্তান যেন সুস্থ থাকে এবং সফলভাবে পরীক্ষা শেষ করে। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জীবনে পাবলিক পরীক্ষা যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। মূলত বিদ্যমান শ্রুতিলেখক নীতিমালাই যুগের পর যুগ তাদের কষ্টের কারণ হয়ে আছে।
দেশের নিয়ম অনুযায়ী কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাঁর হয়ে উত্তরপত্রে লেখার জন্য একজন ব্যক্তি মনোনীত করতে পারেন। সেই ব্যক্তি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী যা বলবেন, সেটি পরীক্ষার উত্তরপত্রে লিখে দেবেন। এ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কিন্তু পদ্ধতিটি আজ পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য নীতিমালার আওতায় আসেনি। এ প্রসঙ্গে দুটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০০৪ সালে। সে সময় একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বোর্ডে আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতিসূচক প্রত্যয়নপত্র জমা দেন। কিন্তু পরীক্ষার মাত্র এক দিন আগে সেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জানানো হয় যে তাঁর মনোনীত শ্রুতিলেখক মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে; যদিও তার ফলাফল আসেনি, তারপরও তাকে অনুমতি দেওয়া যাবে না। তার পরিবর্তে একজন দশম শ্রেণির ছাত্রকে নিতে হবে। ওই সময় দেশের সব স্কুলে দশম শ্রেণিতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা চলছিল, তাই কোনো ছেলে বা মেয়ে শ্রুতিলেখক হতে রাজি ছিল না। আর নবম শ্রেণির ছাত্র এত ওপরের শ্রেণির লেখা কী করে লিখবে। অগত্যা তিনি একজন দশম শ্রেণির ছাত্রের সনদ দিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসা ছাত্রকে দিয়ে তাঁর পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটি এ বছরের; বান্দরবানের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক নেওয়ার জন্য তাঁর মায়ের হাত ধরে শিক্ষা বোর্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেরিয়েছেন। এ বিষয়ে ২০০৪ সালের আইনটি ছিল অলিখিত, ২০২৫ সালে তা লিখিত রূপ পায়। সেখানে শ্রুতিলেখক হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য দশম শ্রেণি, আর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা সেই পুরোনো, গত ১ জুলাই থেকে সারাদেশের স্কুলগুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হয়েছে!
যতটুকু জানা যায়, লিখিত নীতিমালাটি তৈরির সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোর প্রস্তাব ছিল উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য প্রথম বর্ষের আর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বেলায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে শ্রুতিলেখক হিসেবে নেওয়ার। তা কানে তোলা হয়নি। আবার প্রতিবন্ধী অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোও এর কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
সমাজের প্রতিবন্ধী মানুষগুলো শত বাধা অতিক্রম করে লেখাপড়া করছে, তাদের কথা আমরা কেউ শুনছি না। এই মানুষগুলো যে এত কষ্ট করে এত দূর পর্যন্ত এসেছে, সেটিরও কোনো মূল্য নেই আমাদের কাছে। তা না হলে আমরা কোন বিবেচনায় শ্রুতিলেখক হিসেবে একজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর জন্য অষ্টম শ্রেণির ছাত্র এবং উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য় দশম শ্রণির শিক্ষার্থীকে প্রস্তাব করি! উচ্চ মাধ্যমিকের টার্মিনোলজি একজন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কীভাবে বুঝবে? মাধ্যমিকের পড়াশোনার সঙ্গেও তো অষ্টম শ্রেণির অমিলই বেশি।
এত অপরিপক্ব শ্রুতিলেখককে বিভিন্ন জটিল শব্দ বোঝাতেই তো বড় শ্রেণির পরীক্ষার্থীর সময় ফুরিয়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ফল ভালো হবে না। এবারের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। তবে আগামী বছর আমাদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা যেন এ রকম একটি নীতিমালার কারণে আর কষ্ট না পায়, সেদিকে সরকার সুদৃষ্টি দেবে–এ প্রত্যাশা রইল ।
তালুকদার রিফাত পাশা: অ্যাডভোকেসি অফিসার, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি