নাজুক আশ্রয়কেন্দ্র
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অবহেলা নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষকে সহায়তা করিবার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রসমূহের দুর্দশার যেই চিত্র শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হইয়াছে তাহা বেদনাদায়ক। সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ–আইএমইডির প্রতিবেদন এবং সমকালের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা যাইতেছে, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় নির্মিত ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রের প্রতিটারই অবস্থা নাজুক; যাহার ফলে সাড়ে পাঁচশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সকল স্থাপনা বন্যার ন্যায় দুর্যোগের সময় দুর্গতদের তেমন কোনো কাজে আসে নাই। জানা গিয়াছে, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে আরম্ভ হওয়া প্রকল্পটি ২০১৯ সালে সমাপ্ত হইবার কথা থাকিলেও সম্পন্ন হইয়াছে ২০২২ সালে। অর্থাৎ অতিরিক্ত সময় লাগিবার পরেও আশ্রয়কেন্দ্রসমূহ মানসম্মতরূপে গড়িয়া তোলা হয় নাই। যেমন, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রের কোনোটিতেই প্রকল্পের প্রধান চার কার্যক্রম তথা গভীর নলকূপ স্থাপন, গবাদি পশুর আশ্রয়কেন্দ্র, অ্যাপ্রোচ রোড এবং সোলার প্যানেলের কিছুই নাই। অন্যদিকে, বহু আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্যোগে বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হইলেও বর্তমানে সকলই নষ্ট থাকিবার হেতু দুর্যোগকালে আশ্রয় নেওয়া দুর্গতরা বিদ্যুৎসুবিধা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন। বৃষ্টির পানি ধরিয়া রাখিবার ব্যবস্থা হিসাবে ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ স্থাপন করা হইলেও অপরিচ্ছন্নতার কারণে সেইগুলি ব্যবহার করা যাইতেছে না। এই কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় সাম্প্রতিক বন্যার ভয়াবহ রূপ পরিলক্ষিত হইলেও, সেইখানকার দুর্গতরা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়াও স্বস্তিতে থাকিতে পারেন নাই। এমনকি তাহাদের বিদ্যুৎহীন রাত্রি কাটাইতে হইয়াছে, খাবারেরও তেমন ব্যবস্থা ছিল না। কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়া বহুমুখী কমিউনিটি আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্র আসিয়াছে সমকালের প্রতিবেদনে, যথায় ছাদের পলেস্তারা খসিয়া পড়িয়াছে, পিলারেও ফাটল দেখা গিয়াছে এবং উহা পরিণত হইয়াছে, মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানায়। ফলস্বরূপ এইবারের বন্যায় যেই দুইশত পরিবার সেই আশ্রয়কেন্দ্রসমূহে ঠাঁই লইতে চেষ্টা করিয়াছে, তাহাদের এক দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইতেছে।
আশ্রয়কেন্দ্রসমূহের যেই নাজুক পরিস্থিতি দেখা যাইতেছে, তাহাতে বোঝা যাইতেছে একদিকে পরিকল্পনার আলোকে নির্মাণ সম্পন্ন হয় নাই, অন্যদিকে নিয়মিত ভিত্তিতে সেইগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় নাই। আমরা মনে করি, আশ্রয়কেন্দ্রের এই পরিস্থিতির কারণ সেইগুলিকে সরকারের তরফ হইতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই। অথচ একেকটি আশ্রয়কেন্দ্র দুর্যোগকবলিত মানুষের জীবন বাঁচাইবার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখিয়া থাকে। সাধারণত আশ্রয়কেন্দ্রে যে সকল পরিবার যায় তাহারা সমাজের অসহায় ও নিম্ন আয়ের স্তরভুক্ত। এই স্তরের মানুষদের প্রতি যুগের পর যুগ রাষ্ট্রের তরফ হইতে যে অবহেলা পরিলক্ষিত হইয়াছে, মূলত তাহাই এইক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হইয়াছে, যদিও সংবিধান শ্রেণি, ধর্ম, লিঙ্গ বা জন্মস্থানভেদে কোনো বৈষম্যই অনুমোদন করে না।
জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ যেইভাবে ঘন ঘন দুর্যোগের কবলে পড়িতেছে, অবিলম্বে উহা মোকাবিলার যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না হইলে আমরা হয়তো অতীতের সেই ব্যাপক প্রাণ ও সম্পদহানির যুগে ফিরিয়া যাইব, যাহা সকল উন্নয়নকেই অর্থহীন করিয়া দিতে পারে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সমগ্র দেশের আশ্রয়কেন্দ্রসমূহকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করা জরুরি। সেইখানে বিদ্যুৎ, পানি, খাবারসহ মৌলিক জীবনধারণের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। আশ্রয়কেন্দ্রসমূহ সংরক্ষণে আইএমইডি যেই সুপারিশ করিয়াছে, সেইগুলির বাস্তবায়ন দরকার। উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করিয়া সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা এবং জরুরি ভিত্তিতে ভবনের ফাটল, দরজা-জানালার সংস্কার, সোলার সিস্টেম ও ডিপ টিউবওয়েল মেরামত করিবার সুপারিশ আমলে লইতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়